Dreamy Media BD

রাধা বিনোদ পাল

রাধা বিনোদ

পৃথিবীতে মানব আগমনের পর থেকেই যুদ্ধেরও আগমন হয়েছে। গুহা মানবের যুগে মানুষের যুদ্ধ ছিলো মূলত প্রকৃতি ও হিংস্র প্রাণীর বিরুদ্ধে। সভ্যতার আগমনের সাথে সাথে মানুষের যুদ্ধ শুরু হয়েছে মানুষের বিরুদ্ধে। সাম্রাজ্য ধারণা প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে বাড়তে থাকে মানুষে মানুষে যুদ্ধ আর হানাহানি। দুর্বলের উপরে সবলের বল প্রয়োগ আর অত্যাচার। পৃথেবীর ইতিহাসের অনেকটা জুড়েই আছে যুদ্ধ যুদ্ধ আর যুদ্ধ। কালে কালে ধরণ বদলেছে যুদ্ধের। প্রস্থর যুগের হাতিয়ার থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের পারমাণবিক যুদ্ধ, সবই মানব জাতির উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে কোনটা কারণে আবার কোনটা নিছক অকারনে। যুদ্ধের প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ ফলাফল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বহন করেছে সাধারণ জনগণ। মানুষ কখনো যুদ্ধ করেছে সাম্রাজ্য বিস্তারে, কখনো যুদ্ধ করেছে ধর্ম বিস্তারে, কখনো যুদ্ধ করেছে দেশ রক্ষার্থে, কখনো যুদ্ধ করেছে  জেদ চরিতার্থে, কখনো যুদ্ধ করেছে প্রতিহিংসা বাস্তবায়নে, কখনো যুদ্ধ করেছে রাজনৈতিক কারণে। কখনোবা যুদ্ধ করেছে অনেকটা বিনাকারণেই। তেমনই এক বিনাকারণে যুদ্ধ শুরু হয় প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ। অস্টিয়ান এক যুবরাজকে হত্যাকান্ডের ফলে যে যুদ্ধের সূচনা, পরবর্তীতে সেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ইউরোপ থেকে সারাবিশ্বে। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। বলা হয়যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মানব ইতিহাসের অন্যতম ধংসাত্তক যুদ্ধ। এই যুদ্ধের অন্যতম কারিগর জার্মানি মিত্র শক্তির কাছে পরাজয় বরণ করে এবং ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি হয়। আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধ শেয হলেও বাস্তবিক অর্থে যুদ্ধ শেষ হয়েছিলোনা। বলা হয়ে থাকে ভার্সাই চুক্তিতে লুকায়েছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ। ১৯১৩ সাল থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত সংগঠিত যুদ্ধে মানুষের মৃত্যু সংখ্যাটা ছিলো প্রায় দুই কোটি। এতো মানুষর মৃত্যুর মাধ্যমে যেই যুদ্ধের শেষ হয় সেই যুদ্ধের হাত ধরে চলে আসে আর একটি যুদ্ধ, সেটি হলো দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ হলো পৃথিবীর ইতিহাসে সব থেকে ভয়ঙ্কর তম যুদ্ধ। অক্ষ শক্তি হিসেবে এই যুদ্ধ শুরু করে জার্মানি,জাপান ও ইতালি। অপর দিকে মিত্র শক্তি হিসেবে এই যুদ্ধে যোগদান করে ইউরোপের বাকি দেশ গুলা, রাশিয়া ও আমেরিকা। ১৯২৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সময়কে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়কাল ধরা হলেও ১৯২৯ সালের আগে সংগঠিত এশিয়াতে কিছু যুদ্ধকেও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে যেই কইটি দেশ যুদ্ধের জন্যে মুখ্য ভূমিকায় ছিলো, তার মধ্যে অন্যতম হলো জাপান। জাপানের ইতিহাস অনেকটা যুদ্ধ বিগ্রহ সম্পূর্ণ। একটি যুদ্ধবাজ জাতি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগ পর্যন্ত জাপানিজদের পরিচিতি ছিলো। ১৯৪১ সালে পার্ল হারবার আক্রমণের মাধ্যমে জাপান দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জড়িয়ে পরে। জাপান ডাচ  ইস্ট ইন্ডিজে আগ্রাসী হওয়া সার্থে পার্ল হারবার আক্রমণ করে। পার্ল হারবার হলো মার্কিন আওতাধীন হওয়ায় দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত একটি নৌ ও বিমান ঘাঁটি। সামরিক কৌশলগত দিক দিয়ে এটি ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। তার আগে ১৯৩১ সালে জাপানের এশিয়ার প্রবল পরাশক্তি হিসেবে আগ্রাসী মনোভাবের প্রেক্ষাপটে মঞ্চুরিয়া দখলের ফলে সার্বিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। পরবর্তী দশকে ভৌগলিক আওতা পেরিয়ে জাপান চীনের ভূমি দখল করে এবং দেশটির সামরিক শক্তি খর্ব করবার লক্ষে প্রাণপণ চেষ্টা চালায়। ১৯৩৭ সালে জাপান কতৃক ইউএসএস প্যানের উপর আক্রমণ এবং নানকিং গণহত্যার জন্যে (দুই লক্ষ বাছবিচারহীন হত্যাকাণ্ড) পরবর্তীতে আন্তর্যাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জাপানকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। এই অভিযোগের পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় চলাকালীন জাপানি সৈনিক দ্বারা সংগঠিত গুম ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের জন্যে দোষী সাবস্থ করে রাজনীতিবিদ, সেনা কর্মকার্তা,ও যুদ্ধপরাধের সাথে জড়িত আরো কিছু ব্যাক্তিকে বিচারের আওতায় আনা হয়। ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। ছয় বছর ধরে চলা যুদ্ধে মোট প্রাণহানি দাড়ায় ছয় কোটিরও বেশী মানুষের। তবে কিছু কিছু হিসাব বলে এই প্রাণহানির সংখা দশ কোটির বেশি। আর সামরিক বেসামরিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণতো সীমাহীন। ১৯৪৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে দুইটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে সমাপ্তি টানা হয় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা বিস্ফোরণের ফলে যে প্রাণহানি আর ধ্বংসযজ্ঞ হয়, সেটাও ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। ১৯৪৫ সালে লন্ডন সনদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় মিত্র পক্ষের সাথে থাকা দেশগুলো ছাড়াও গ্রিস, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, যুগোস্লাভিয়া সহ অন্তত বিশটি দেশ ঐ চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিলো। নুরেমবার্গ ট্রাইয়ালের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট। এই ট্রায়াল টোকিও ট্রায়াল হিসেবেই পরিচিত। টোকিও ট্রায়ালে বিচারক হিসেবে বিচারকার্য পরিচালনার জন্যে সারা পৃথিবী থেকে বাঘা বাঘা এগারো জন বিচারকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

সেই এগারো জন বিচারকের মধ্যে একজন ছিলেন রাধা বিনোদ পাল। বাকি দশ জন বিচারক ছিলেন যুক্ত্ররাষ্ট্র, যুক্ত্রারাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড ও ফিলিপিন্সের নাগরিক। একজন বাঙালি বিচারক হয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এতো বড় এবং এতো সেন্সেটিভ ট্রাইব্যুনাল পরিচালনা করে রাধা বিনোদ পাল বাঙ্গালীর মর্যাদাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য যায়গায়। দেশ ভাগ তথা স্বাধীনতা উত্তর এই দেশের খুব কম মানুষই এতো বড় পর্যায়ে যেয়ে নিজের কর্ম গুনে আজীবনের জন্যে সুনাম কুড়িয়েছে। রাধা বিনোদ পাল বিচক্ষণ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করবার পাশাপাশি জাপানের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে তার রায় জাপানের পক্ষে যায় বলে জাপান তথা জাপানের জনগণ অনেক বড় ক্ষতিপূরণের হাত থেকে বেঁচে যায়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে পরাজয় বরণের জন্যে সারা বিশ্বের রোষানলে পড়ে। পরাজিত শক্তি হিসেবে অনেক ক্ষয় ক্ষতি ও গ্লানি বরণ করে নিতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ধংস ও ক্ষয় ক্ষতিকে সাথে নিয়ে জাপান সরকার তার দেশ গঠনে মনোনিবেশ করে। পূর্বের যুদ্ধবাজ চিন্তাধারাকে বাদ দিয়ে দেশ গঠন ও অর্থনৈতিক উন্যয়নকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে। আর পরবর্তী ইতিহাস শুধুই উন্নয়নের। জাপান বিশ্বের সব থেকে বড় অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সব থেকে বড় উন্নয়ন সহযোগী দেশ হলো জাপান। তারা বাংলাদেশে একক ভাবে যতো সহযোগিতা করেছে তা বিশ্বের অন্য কোন দেশ এখন পর্যন্ত করেনাই। তৎকালীন সময়ে জাপানের সম্রাট হিরোহিত বলেছিলেন, “ যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থ কষ্ঠে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু ”। সত্যই তাই, তারা আমাদের চিরকালের জন্যে পরম বন্ধু হয়ে থেকেছে সবসময়। বাংলাদেশর আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সব সময় পাশে থেকে গিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ, যোগাযোগ, কলকারখানা, প্রযুক্তি, গবেষণা, বিনিয়োগ, কৃষি ও মানব উন্নয়ন এই সব গুলো ক্ষত্রেই সহযোগীতা করে গেছে সবসময়। বাংলাদেশকে তারা সবসময় সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে গেছে, এবং কিছু কিছু ঋণ শোধের শর্ত হিসেবে বলেছে দেশের প্রান্তিক উন্নয়ন করলে ঋণ মউকুফ করা হবে। এতো আন্ত্ররিকতার সাথে আমাদের দেশের উন্নয়নে পাশে স্বাধীনতার পর থেকে অন্যকোন দেশ থাকেনাই। এসবের জন্যে পেছনের কারিগর হলো রাধা বিনোদ পাল। আজ জাপানিজরা পৃথিবীর অন্যতম ভদ্র ও বিনয়ী জাতি হিসেবে পরিচিত। তারা তাদের বিনয়ের যথেষ্ট প্রয়োগ দেখিয়েছে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির উপর।

সম্রাট হিরোহিতোর বক্তব্যটি একজন বাঙালির প্রতি জাপানের কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ। ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ইয়াসুকুনি স্মৃতিসৌধটি টোকিওর চিয়োদা অঞ্চলে অবস্থিত। এটি স্থাপিত হয়েছে প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের স্মৃতির সন্মানে। এসব মানুষ জাপানের পক্ষে অথবা জাপানের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে কিম্বা যুদ্ধ কেন্দ্রিক কোনো সহিংসতার শিকার হয়ে মারা গিয়েছিলেন। সেখানে শুধু একটি মাত্র স্মৃতিস্তম্ভ ব্যতিক্রম। যার স্মরণে সেটি তৈরি করা হয়েছে, তিনি এই ধরণের কোন যুদ্ধ বা সহিংসতায় নিহত হননি। তিনি হলেন রাধা বিনোদ পাল। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভারতীয় এই নাগরিককে জাপানে জাতীয় বীরদের পর্যায়ে সম্মাননা দেয়া হয়।

রাধা বিনোদ পালের

জন্ম ১৮৮৬ সালে অবিভক্ত বাংলার জেলা কুষ্টিয়া, দৌলতপুর উপজেলার ছলিমপুর গ্রামে। তার পিতার নাম বিপিন বিহারি পাল। রাধা বিনোদ যখন ছোট তখন তার বাবা সন্যাস গ্রহণ করেন। রাধা বিনোদের শৈশব ও কৈশোর কাটে চরম দারিদ্রের মধ্যে। কৈশোরের একটি বড় সময় আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রিত থেকে পড়ালেখা করতেন। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়ানের গোলাম রহমান পণ্ডিতের কাছে তার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হয়। তিনি তৎকালীন নদিয়া জেলার (বর্তমানে কুষ্টিয়া) তারাগুনিয়া এল পি স্কুলে ও পরে কুষ্টিয়া হাই স্কুলের থেকে ১৯০৩ সালে এন্ট্রান্স ও ১৯০৫ সালে ১৯০৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ পাস করেন। কোলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে গণিতে অনার্স পাস করেন ১৯০৮ সালে। ১৯২০ সালে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও ১৯২৫ সালে আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। রাধা বিনোদ পাল কর্মজীবনের শুরুটা হয় ময়মসিংহে, আনন্দমোহন কলেজের গণিতের শিক্ষক হিসেবে। শিক্ষকতার পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়াশোনাও চালিয়ে যান, দায়িত্ব পালন করেন কলকাতা ল কলেজের অধ্যাপক হিসেবে। পরবর্তীতে  ১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাধা বিনোদ ১৯৪৬ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ছলিমপুরে নিজ বাসভবনে ফিরে আসেন। অবসর সময়টা সেখানে কাটাবেন বলে, কিন্তু সেই বছরই এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে যোগ দেয়ার আমরন্ত্রণ পান। চলেযান টোকিও ট্রায়ালে অংশগ্রহণের জন্যে।

ট্রাইব্যুনালে শুধু দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ঘটা যুদ্ধপরাধ বিবেচনা না করে ১৯৩১ সালে মাঞ্চুরিয়া দখল থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সব অপরাধ বিচার করার  এখতিয়ার নেয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তিন ধরণের অভিযোগ আনা হয়- শান্তিবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই ট্রায়ালের অভিযুক্তদের তালিকা থেকে জাপানের সম্রাট হিরোহিতোকে বাদ দেয়া হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের অধিকাংশ বিচারক যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরধী অপরাধ এবং শান্তিবিরোধী অপরাধের দায়ে জাপানের নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করলেও রাধা বিনোদ পালের অবস্থান ছিলো তাদের বিপরীত। ট্রায়ব্যুনালের রায়ের তার প্রশ্ন ছিল, “ যারা জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল গঠন করার এবং নিজেদের শর্ত অনুযায়ী পারাজিত শত্রুদের বিচার করার নৈতিক অধিকার আছে কি না”। নেদারল্যান্ডস ও ফিলিপিন্সের একজন বিচারপতি যদিও মিঃ পাল কে নৈতিক সামর্থন জানিয়েছিল , কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়কে অনেকটা বাধ্য হয়েই মানা নিয়েছিল। রাধা বিনোদ পালের বক্তব্য ছিল, “ট্রায়ালে জাপানকে যে সব অপরাধের জন্যে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, অভিযোগকারী পক্ষরা  নিজেরাই সেসব অপরাধ সংঘটন করে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ। বিচারক পাল তার রায়ে মন্তব্য করেন যে তৎকালিন সময়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সের মত যে সব দেশের উপনিবেশ ছিল বিভিন্ন দেশে, সেসব দেশের মানুষের উপর যুদ্ধকালীন সময় ছাড়াও তারা শান্তি বিরোধী ও মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠন করেছে। এছাড়াও জাপানের বিরুদ্ধে আনা অপরাধের অভিযোগে অপরাধের মাত্রা অতিরঞ্জিত করেও উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও তার বিচারে মত প্রকাশ করেন। রাধা বিনোদ পালের ৮০০ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই সেটিকে নিষিদ্ধ করে জাপান অধিগ্রহণকারী মার্কিন বাহিনী। আর মজার বিষয় হল যেদিন মার্কিন বাহিনী জাপান ছেড়ে চলে যায়, সেই দিন রায়টি জাপানে প্রকাশিত হয়। এই রায় বিশ্বনন্দিত ও ঐতিহাসিক রায়ের মর্যাদা লাভ করে। এই রায় জাপানকে তার সহিংতার দীর্ঘ পরম্পরা ত্যাগ করে সভ্য ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনে মনোনিবেশ করবার জন্যে প্রধান ভুমিকা পালন করেছিল। টোকিও ট্রায়ালে রাধা বিনোদ পালের শক্ত অবস্থানের কারণে জাপানকে অনেক কম ক্ষতিপূরণের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। নয়ত যে ক্ষতিপূরণের বোঝা মিত্রপক্ষ ও অন্য বিচারকরা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তার দায় এখন পর্যন্ত টানতে হত জাপানকে।

 

ব্যাক্তি জীবনে চরম সফলতার পাশাপাশি রাধা বিনোদ পাল এই দেশকে মর্যাদার এক আসন দিয়ে গেছেন। ১৯৬৬ সালে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো তাকে জাপানের সর্বোচ্চ একাডেমিক খেতাব ‘ ফার্স্ট অর্ডার অব সেক্রেড ট্রেজার’ ও ‘কোক্কা কুনশোও’ প্রদান করেন। তিনি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক ‘পদ্মবিভূষণ’ এ ভূষিত হন। তিনি নয় মেয়ে ও পাঁচ ছেলের জনক ছিলেন। জাপান সরকার তাকে এতটাই শ্রদ্ধা করতো যে টোকিও শহরে তার নামে একটা রাস্তার নাম রেখেছে। আর কিয়োটা শহরে তার নামে জাদুঘর, রাস্তা ও তার স্ট্যাচু করেছে। এই গুণী মানুষটি ১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Related Post

খুশির স্ট্যাটাস

200+ স্টাইলিশ খুশির স্ট্যাটাস | হাসি নিয়ে ক্যাপশন

খুশির স্ট্যাটাস | হাসি নিয়ে ক্যাপশন জীবনের সুন্দর খুশির মুহূর্ত আমরা সবাই বাঁধাই করে রাখতে চাই। আর এই খুশির মুহূর্তকে ধরে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায়

Read More »
❤love status bangla | ভালোবাসার ছন্দ | রোমান্টিক ছন্দ | প্রেম ছন্দ স্ট্যাটাস❤

স্টাইলিশ ভালোবাসার ছন্দ | রোমান্টিক ছন্দ | Love Status Bangla

❤❤ভালোবাসার ছন্দ | ভালোবাসার ছন্দ রোমান্টিক | ভালোবাসার ছন্দ স্ট্যাটাস❤❤ ভালোবাসা হলো এক অন্যরকম অনুভূতির নাম, যা শুধুমাত্র কাউকে ভালবাসলেই অনুভব করা যায়। আমরা বিভিন্নভাবে

Read More »
মন খারাপের স্ট্যাটাস

মন খারাপের স্ট্যাটাস, উক্তি, ছন্দ, ক্যাপশন, কিছু কথা ও লেখা

মন খারাপের স্ট্যাটাস মন খারাপ – এই কষ্টের অনুভূতি কার না হয়? সবারই কখনো না কখনো সবারই মন খারাপ হয়। জীবনের ছোটোখাটো অঘটন থেকে শুরু

Read More »
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলা হয় বিশ্বকবি। তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও গুনী লেখক। প্রেম চিরন্তন এবং সত্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালীর মনে প্রেমের

Read More »
ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা

ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা | Breakup Status Bangla

ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা আপনি কি আপনার প্রিয়জনের সাথে সম্পর্ক থেকে বের হয়ে এসেছেন? আর সেটা আপনি কোন ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা মাধ্যমে বোঝাতে চাচ্ছেন। তাহলে আপনি

Read More »

Leave a Comment

Table of Contents