অধ্যবসায় রচনা | ২০ টি পয়েন্ট | উক্তি সহকারে ২৫০০+ শব্দ | pdf download

অধ্যবসায়

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুর আজকে আমরা হাজির হয়েছি খুবই গুরুপ্তপূর্ণ একটি রচনা “অধ্যাবসায়” নিয়ে। রচনাটি ২০ টি পয়েন্টে ২৫০০+ শব্দে , প্রয়োজনীয় উক্তি ও কবিতা সহকারে লেখা হয়েছে। রচনাটি এসএসসি , এচইএসসি সহ যেকোনো চাকরির এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য তোমাদের অনেক সাহায্য করবে।      

অধ্যবসায়

ভূমিকা

জীবনের পথ চলা কখনোই সমতল বা বিপত্তিহিন নয়। পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণের মতোই, প্রত্যেক কাজেই চড়াই-উতরাই, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আসতে হয়। কিন্তু জীবনের এই সংগ্রামী অভিযাত্রায় এক অদম্য শক্তি আমাদের পথ দেখায়, প্রেরণা জোগায় – সেই শক্তিটি হলো অধ্যবসায়। অধ্যবসায়, শুধুমাত্র কোনো কাজ শেষ করার ক্ষমতা নয়, এটি অসম্ভবকে সম্ভব করার দৃঢ়তা। জগতে কোনাে কাজ চেষ্টা বা উদ্যম ব্যতীরেকে সম্পন্ন হয় না, তাই কবি বলেছেন –

‘কেন পান্থ ক্ষান্ত হও, হেরি দীর্ঘ পথ
উদ্যম বিহনে কার পুরে মনােরথ ?

এটি কখনো হাল না ছেড়ে দেওয়ার, ব্যর্থতার ছায়া সরিয়ে আবার চেষ্টা করার অদম্য চেতনা। এটি সেই আগুন, যা আমাদের ভেতরে জ্বলে উঠে, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করে।

অধ্যবসায়ের স্বরূপ

অধ্যবসায় শব্দের অর্থ হলো অবিরাম সাধনা। কোনো কাজে সফল হওয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করা, কখনো হাল না ছেড়ে দেওয়া, এই গুণটিকে বলে অধ্যবসায়।

অধ্যবসায় শুধু একটি শব্দ নয়, এটি জীবনের পথে চলার এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। এটি সেই অবিরাম সাধনা, দুর্বার ইচ্ছাশক্তি, যা আমাদেরকে যেকোনো কঠিনতার মধ্যে দিয়েও লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ দেখায়। এটি সেই অদম্য আত্মবিশ্বাস, যা হতাশার অন্ধকারেও আশার দীপ জ্বালিয়ে রাখে।

ইতিহাস বহু অধ্যবসায়ী মানুষের গৌরবকাহিনীতে ভরপুর। গ্যালিলিও গ্যালিলাই গির্জার বিরোধিতা সত্ত্বেও পৃথিবী গোলক বলে প্রমাণ করেছিলেন; হেলেন কেলার শোন, কথা বলতে না পারার প্রতিবন্ধ সত্ত্বেও লেখালেখি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত হয়েছিলেন। এইসব উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অধ্যবসায়ই সেই হাতিয়ার, যা কোনো বাধাও আমাদের লক্ষ্য পূরণ থেকে বিরত রাখতে পারে না।

তবে, অধ্যবসায় শুধুমাত্র বিখ্যাতদের গল্প নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও কাজ করে। যখন কোনো পরীক্ষার প্রস্তুতি, কোনো প্রতিযোগিতায় জয় লাভ, নতুন শেখার আহরণ এইসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াই, তখনই অধ্যবসায় আমাদের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যায়। এটিই সেই শক্তি, যা আমাদেরকে বারবার উঠতে শেখায়, ঠোক্কর খেয়েও হার না মানিয়ে নতুন পথ ধরতে উৎসাহিত করে।

অধ্যবসায়ী ব্যক্তির গুণাবলী

অধ্যবসায় কেবল একটা শব্দ নয়, এ এক বীরত্বের গুণ। যেখানে প্রতি মুহূর্তে জাগে লক্ষ্য পূরণের আগুন, যেখানে বাধা এসেও ফিরে যায় দৃঢ়তায়, যেখানে ব্যর্থতা শেখায় আরও দৃঢ় হয়ে উঠতে। এই অদম্য গুণ অধ্যবসায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যা অধ্যবসায়ী ব্যক্তির মাঝে পাওয়া যায়:

১. স্বপ্নদ্রষ্টা চোখ: অধ্যবসায়ীরা স্বপ্ন দেখে, প্রখর চোখে ভবিষ্যতকে আঁকে। তারা জানে কোথায় পৌঁছাতে চায়, কীভাবে পৌঁছাতে চায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদেরকে অবিচল পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

২. অব্যাহত প্রচেষ্টা: অধ্যবসায়ের চালিকাশক্তি হল অব্যাহত প্রচেষ্টা। তারা জানে, সাফল্য রাতারাতি আসে না। প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়াই তাদের মূলমন্ত্র।

৩. অদম্য ইচ্ছাশক্তি: অধ্যবসায়ীদের মধ্যে থাকে অদম্য ইচ্ছাশক্তি। বাধা-বিপত্তি তাদের পথ আটকে দিতে পারে না। তারা জানে, প্রতিটি বাধা হল একটি শিক্ষা, একটি অভিজ্ঞতা, যা তাদের আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

৪. আত্মবিশ্বাসের বর্ম: অধ্যবসায়ীদের ঢাল হল আত্মবিশ্বাসের বর্ম। তারা নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস রাখে। তারা জানে, তারা যা করতে চেয়েছেন, তা তারা পারবেন।

৫. নমনীয়তা: অধ্যবসায়ীরা জানে, শক্ত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি নমনীয় হওয়াও প্রয়োজন। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে নরম করতে, পথ বদলাতে তারা দ্বিধা করেন না।

৬. ধৈর্য্যের সাগর: অধ্যবসায়ীরা ধৈর্য্যের সাগর। তারা জানে, ফুল ফোটাতে সময় লাগে, স্বপ্ন সত্যি হতে সময় লাগে। তাই তারা অস্থির হন না, ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করেন।

৭. শিক্ষার অনুসন্ধান: অধ্যবসায়ীরা প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে শেখে। তারা জানে, ব্যর্থতা শিক্ষার অন্যতম উৎস। তাই তারা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ান।

৮. অনুপ্রেরণার বাহক: অধ্যবসায়ীরা অন্যদের অনুপ্রেরণার উৎস। তাদের লড়াই, তাদের সাফল্য, তাদের ইতিবাচক মনোভাব অন্যদের উৎসাহিত করে।

এই বৈশিষ্ট্যগুলি শুধু কথায় উচ্চারণ করার বিষয় নয়, এগুলো হল জীবনধারা। অধ্যবসায়কে জীবনে গ্রহণ করলে, জীবন হয়ে ওঠে অপূর্ব সুন্দর, এবং লক্ষ্য পূরণের মহাযাত্রা।

অধ্যবসায়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য 

অধ্যবসায়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে এককথায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি জীবনের নদীর দুই তীরের মধ্যে সেতুর মতো, যে আমাদের সাধারণ জীবন থেকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়। এটি সেই অদম্য শক্তি, যা প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে, বাধা অতিক্রম করতে এবং কঠিন লক্ষ্য অর্জন করতে আমাদের সাহায্য করে।

প্রথমত, এটি আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করে। এটি আমাদের মনোযোগী করে তোলে, প্রতিটি পদক্ষেপে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

দ্বিতীয়ত, অধ্যবসায় আমাদের আত্মবিশ্বাসের বর্ম পরিধান করিয়ে দেয়। আমরা বুঝতে পারি, যেকোনো বাধা অতিক্রমের শক্তি আমাদের মধ্যে আছে। এই আত্মবিশ্বাসই আমাদের সামনে আসা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার সাহস দেয়।

অবশেষে, অধ্যবসায় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যেরই নিশ্চয়তা দেয় না, এটি সমাজ উন্নয়নেও অবদান রাখে। যখন আমরা সকলেই নিজের কাজে অধ্যবসায়ী হয়ে নিজেদের সেরাটা দিই, তখন তা পুরো সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, সাহিত্য- সর্বক্ষেত্রেই অধ্যবসায়ের গুণের প্রয়োজন। এটিই সেই শক্তি, যা আমাদের দেশকে উন্নয়নের চূড়ায় পৌঁছে দিতে পারে।

ব্যক্তি জীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব 

ব্যক্তি জীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। অধ্যবসায়ের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে ফ্র্যাঙ্ক লয়েড বলেন –

সাফল্যের জন্য ৩টি মূল্য দিতে হবে: ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম, আর স্বপ্নকে বাস্তব হতে দেখার জন্য ব্যর্থতার পরও কাজ করে যাওয়া।

 অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আমরা যেসব সুবিধা পেতে পারি, সেগুলো হল:

  • স্বপ্ন পূরণ: অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। যেকোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য অধ্যবসায় অপরিহার্য।
  • ব্যক্তিত্বের বিকাশ: অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। অধ্যবসায়ী ব্যক্তিরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, মনোযোগী, ধৈর্যশীল, পুনরুদ্ধারক্ষম এবং আত্মবিশ্বাসী হয়। এই গুণগুলো সুন্দর ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করে।
  • আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আমাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। যখন আমরা কোনো কাজে সফল হই, তখন আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এই আত্মবিশ্বাস আমাদের আরও ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।
  • সাফল্য অর্জন: অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আমরা সাফল্য অর্জন করতে পারি। জীবনে অনেক চ্যালেঞ্জ আসে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার জন্য আমাদের দরকার অধ্যবসায়।

অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আমরা একজন সম্পূর্ণ মানুষ হতে পারি। একজন সম্পূর্ণ মানুষের মধ্যে যেসব গুণ থাকা উচিত, অধ্যবসায় তার অন্যতম 

সাফল্যের চাবিকাঠি অধ্যবসায় 

অধ্যবসায় সাফল্যের চাবিকাঠি, এই কথাটি যেন খাঁটি সোনায় লেখা। বিজ্ঞানের ইতিহাস বহু অধ্যবসায়ী মানুষের গল্পে ভরা, যারা তাদের লক্ষ্যের পথে বাধা, ব্যর্থতা, এমনকি ধোঁয়াশা দেখেও হাল ছাড়েননি। এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন।

ছোটবেলা থেকেই আইনস্টাইন ভিন্নধারার ভিন্ন চিন্তার মানুষ ছিলেন। তিনি সব কিছুতেই প্রশ্ন করতেন, চিন্তায় ছিলেন স্বতন্ত্র। কিন্তু তার পথ সহজ ছিল না। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন বাতিল হলে কেরানির চাকরি নেন। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। ধৈর্য্য ধরে গবেষণা চালিয়ে গেছেন। অবিরাম চিন্তা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর অধ্যবসায়ের ফল তার, “আপেক্ষিক তত্ত্ব”। জগৎ তখন বুঝতে পারে, আইনস্টাইন একজন মহান বিজ্ঞানী, যিনি সময়ের ধারণাটাই পাল্টে দিয়েছেন। যা বিশ্বখ্যাত লেখক ও মোটিভেটর ডেল কার্নেগীর এক বিখ্যাত উক্তিরই যেন প্রতিরূপ–

ব্যর্থতার ছাই থেকে সাফল্যের প্রাসাদ গড়ো। হতাশা আর ব্যর্থতা হলো সাফল্যের প্রাসাদের দুই মূল ভিত্তি

আইনস্টাইনের গল্প শেখায়, সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই। প্রয়োজন ধৈর্য্য, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, আর অব্যাহত চেষ্টা। আমরা যদি নিজের লক্ষ্যকে জোর করে ধরে রাখি, বাধা অতিক্রম করার শক্তি খুঁজে বের করি, তাহলে একদিন সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আমাদের হাতে এসে ধরা দিবে। তাই আসুন, আজ থেকেই অধ্যবসায়ী হই, আর নিজের সাফল্যের গল্প লিখি।

ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়

ছাত্রজীবন হল একটি মূল্যবান সময়, যেখানে শেখা, বেড়ে ওঠা, নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ থাকে। এই সময়ে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল ভালো ফলের নিশ্চয়তা দেয় না, বরং একজন সফল ব্যক্তি, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং সমাজের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।

অধ্যবসায়ী ছাত্ররা নিজেদের লক্ষ্যকে স্পষ্টভাবে দেখে। তারা জানে কোথায় পৌঁছাতে চায়, কী অর্জন করতে চায়। এই স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তাদেরকে কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত অধ্যয়ন ও পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। ফলস্বরূপ, তারা শিক্ষাগত সাফল্য অর্জন করেন, জ্ঞানের গভীরতা অর্জন করেন এবং কোনো বাধা আসলেও হতাশ না হয়ে আবার উঠে দাঁড়ান।

এই সুশৃষ্ট ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে অধ্যবসায়ী ছাত্ররা পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্যও অবদান রাখে। তারা শিক্ষিত ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে, যারা তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে পারে। তাই, ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়কে অঙ্গীকার করেতে হবে। কঠিন পরিস্থিতিতে হাল ছাড়ব না, বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা করব। এই অধ্যবসায়ের পথই একদিন আমাদেরকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেবে, আর সেখান থেকেই আমরা নিজেদের ও আমাদের সমাজের উজ্জ্বল ভবিষ্যত অর্জন করতে পারব।

জাতীয় অর্থনীতি ও অধ্যবসায়  

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যর গল্প অধ্যবসায়ের স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দারিদ্র্য, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ – এসব চ্যালেঞ্জের পাহাড় অতিক্রম করেছে এই দেশ, তার অবিরাম পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে। আর এই পরিশ্রমের চালিকাশক্তি হল অধ্যবসায়।কবি সুকান্তের ভাষায়,

 সাবাস, বাংলাদেশ, 

এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়: 

জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার 

তবু মাথা নোয়াবার নয়।

অধ্যবসায়ী কৃষকরা কঠোর পরিশ্রমে ফসলের ফলন বৃদ্ধি করেছে, রপ্তানি আয় বাড়িয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে অধ্যবসায়ী শ্রমিকরা নিপুণ হাতে কাপড়ে বুনেছে সাফল্যের গল্প। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অধ্যবসায়ী মানুষেরা উন্নয়নের মশাল জ্বালিয়েছে। নতুন উদ্যোক্তারা সাহসিকতা আর অধ্যবসায়ের বলে গড়ে তুলেছে নতুন ব্যবসা, সৃষ্টি করেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১০৫ ডলার। ২০২৩ সালে তা বেড়েছে ২৮২৫ ডলারে। রপ্তানি আয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ১৯৭৪ সালে যেখানে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে তা বেড়েছে ৬৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই উন্নয়নের পিছনে অধ্যবসায়ের অবদান অস্বীকার করা যায় না।

তাই, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অধ্যবসায় হল এক উজ্জ্বল রশ্মি। এই রশ্মিকে ধরে রেখে, অবিরাম পরিশ্রম করে এগিয়ে গেলে, বাংলাদেশ অর্জন করবে আরও বেশি সাফল্য, গড়ে তুলবে আরও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

প্রতিভা বনাম অধ্যবসায় 

প্রতিভা বনাম অধ্যবসায়ের বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলছে। অনেকে বিশ্বাস করেন যে প্রতিভাই সাফল্যের চাবিকাঠি, অন্যরা বিশ্বাস করেন যে অধ্যবসায়ই সবকিছু।

যারা প্রতিভাকে বেশি গুরুত্ব দেন তারা বলেন যে কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই অন্যদের তুলনায় বেশি প্রতিভাবান। তারা যেকোনো ক্ষেত্রেই সহজেই সফল হবে। উদাহরণস্বরূপ, অনেকেই বিশ্বাস করেন যে মাইকেল জর্ডন বা লিওনেল মেসির মতো খেলোয়াড়দের জন্মগত প্রতিভা ছিল যা তাদের খেলাধুলায় সফল হতে সাহায্য করেছিল।

অন্যদিকে, যারা অধ্যবসায়কে বেশি গুরুত্ব দেন তারা বলেন যে, প্রতিভা শুধুমাত্র একটি ভিত্তি। সাফল্যের জন্য অধ্যবসায় অপরিহার্য। তারা বলেন যে এমন অনেক মানুষ রয়েছে যাদের প্রতিভা নেই কিন্তু তারা অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সফল হয়েছে। বিখ্যাত উদ্যোক্তা স্টিভ জবস বলেছিলেন,

 “প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের মধ্যে পার্থক্য হল, প্রতিভা আপনাকে দৌড়ে শুরু করতে সাহায্য করে, কিন্তু অধ্যবসায় আপনাকে জিতেয়ে দেয়।”

অন্যদিকে, বিখ্যাত ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার বলেছিলেন, 

“প্রতিভা শুধুমাত্র একটি ধারণা। অধ্যবসায়ই সত্যিকারের প্রতিভা।”

এই উক্তি গুলো থেকে বোঝা যায় যে, প্রতিভা ছাড়াও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। প্রতিভাবান ব্যক্তিদেরও সাফল্য অর্জনের জন্য অধ্যবসায়ের প্রয়োজন হয়।

অধ্যবসায়ের দৃষ্টান্ত

অধ্যবসায় মানুষকে সাফল্যের আসনে বসিয়ে দেয়। ইতিহাসের পাতায় অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে এমন মানুষদের, যারা অবিরাম পরিশ্রম ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার বলে অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেখিয়েছেন।

প্রথমেই আসে মহাকবি ফেরদৌসীর কথা। ইরানের জাতীয় মহাকাব্য শাহনামা রচনা করতে তিনি ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। অসংখ্য বাধা, অপমান, এমনকি দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েও তিনি থেমে থাকেননি। অবশেষে তার অক্লান্ত পরিশ্রম ফল বয়ে এনেছে। আজ শাহনামা ইরানের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ফেরদৌসী ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস অধ্যবসায়ের আরেক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইংল্যান্ডের সাথে স্বাধীনতার যুদ্ধে তিনি প্রথম ছয়বার পরাজিত হন। হতাশায় এক গুহায় আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি একটি মাকড়সার বারবার জাল বোনা ও শিকার ধরার ব্যর্থ চেষ্টা দেখে অনুপ্রাণিত হন। সপ্তমবার যুদ্ধে নামেন তিনি, অবিচল দৃঢ়তার সাথে। ফলস্বরূপ, ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা অর্জন করেন। তার গল্প শেখায়, কখনো হাল ছাড়া না দেওয়া এবং অধ্যবসায়ের শক্তি কত গভীর।

শুধুমাত্র শিল্পসাহিত্য বা রাজনীতি নয়, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। থমাস আলভা এডিসন বাতির ফিলামেন্ট তৈরির চেষ্টায় এক হাজারেরও বেশিবার ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত তার অক্লান্ত প্রচেষ্টা সাফল্য বয়ে আনে, এবং বিশ্বকে আলোকিত করে।

আরেক বিখ্যাত অধ্যবসায়ী সাধক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তার কর্মকান্ডে অপূর্ব নিদর্শন রেখে গেছেন। তিনি বলেছেন,

Impossible is a word which is only found in the dictionary of a fool.

এই ইতিহাসবাহী গল্পগুলো আমাদের শেখায় যে, সাফল্যের পথ সহজ নয়। বাধা-বিপত্তি আসবেই। কিন্তু অধ্যবসায় থাকলেই শুধুমাত্র এই বাধাগুলো কাটিয়ে উঠে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।  

জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়

জীবন এক দীর্ঘ পথ, যেখানে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন অবিরাম চেষ্টার, অদম্য ইচ্ছাশক্তির, আর অধ্যবসায়ের। বিশ্বের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বরা তাদের অসাধারণ সাফল্যের গল্পে বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রতিভা থাকলেও সাফল্যের পথে অধ্যবসায়ই হল চালক শক্তি। বিখ্যাত বাস্কেটবল তার মাইকেল জর্ডানের কথা ধরা যাক, যিনি বলতেন, 

“আমি বারবার ব্যর্থ হয়েছি, আর এটাই আমার সাফল্যের গোপন রহস্য।”

অধ্যবসায় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়। একজন দরিদ্র পরিবারের ছেলে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মেধাবী ছাত্র হয়, তারপর ডাক্তার হয়ে গ্রামের মানুষের সেবা করে। একজন নারী অক্লান্ত পরিশ্রমে ব্যবসায় সফল হয়, তার পরিবারের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটায়। এক যুবক অধ্যবসায়ের ঘামে সিক্ত হয়ে ক্রীড়াবিদ হয়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনে। এই সবই অধ্যবসায়ের জয়গান।

অবশ্যই, পথে বাধা আসবে। জীবনের মহাপথে অধ্যবসায় হল সেই দৃঢ় রণপা, যা দিয়ে কঠিনতার পাহাড় পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো যায়।

অধ্যবসায়ের চর্চা  

অধ্যবসায়, সেই নিরলস সাধনা, অবিচল দৃঢ়তা, আর কঠোর পরিশ্রমের সমন্বয় – এটাই সেই শক্তি, যা আমাদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়। কিন্তু কীভাবে আমরা এই অধ্যবসায়ের চর্চা করব? 

অধ্যবসায় চর্চার উপায় সমূহঃ

  • সবার আগে আমাদের জন্য সুস্পষ্ট, বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। হতে পারে ছোটখাটো কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন, বা বড় পরিকল্পনা, উচ্চ শিক্ষা, স্বপ্নের চাকরি, বা নিজের ব্যবসা শুরু করা।
  • লক্ষ্য নির্ধারণের পর তা অর্জনের জন্য একটা সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।  
  • অধ্যবসায় ছাড়া সাফল্য অসম্ভব। প্রতিদিন আমাদের নিজের লক্ষ্য অর্জনে সময় ও শক্তি ব্যয় করতে হবে।  
  • নিজের উপর আস্থা রাখতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে যে, আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারি। আত্মবিশ্বাসই আমাদের অধ্যবসায়ের জ্বালানী।
  • নিজের মতো অধ্যবসায়ী মানুষদের গল্প পড়তে হবে, তাদের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে।

সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, 

Failure is the pillar of success.

ব্যর্থতা আসবেই, হতাশাও আসবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে শেখা যায়। হতাশাকে কাটিয়ে উঠতে হবে। এভাবেই আমরা অধ্যবসায় চর্চা করতে পারি। 

অধ্যবসায়ের শিক্ষা  

অধ্যবসায় শুধু একটি গুণ নয়, এ এক জীবন শিক্ষা। এটি এমন শক্তি যা আমাদেরকে কঠিন সময়ে পাহাড় সরিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। অধ্যবসায়ের চর্চা থেকে আমরা শিখি যে দৃঢ়সংকল্প এবং পরিশ্রম ছাড়া কোনো সাফল্য আসে না। ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু আমাদের থেমে থাকা চলবে না। তাইতো কবি বলেছেন-

পারিব না এ কথাটি বলিও না আর, 

পারো কি না পারো করো যতন  আবার, 

একবার না পারিলে দেখো শত বার। 

এই শিক্ষা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগে। পড়াশোনা, কাজ, শিল্প, খেলা, সব ক্ষেত্রেই অধ্যবসায়ই সাফল্যের চাবিকাঠি। 

বিজ্ঞানের আবিষ্কারে অধ্যবসায়

বিজ্ঞানের ইতিহাস গাঁথা হয়েছে অবিশ্রান্ত অধ্যবসায়ের সুতোয়। প্রতিটি আবিষ্কারের পিছনেই রয়েছে একজন অধ্যবসায়ী বিজ্ঞানীর কাহিনী, যিনি প্রতিকূলতা, ব্যর্থতাকে উপেক্ষা করে সত্যের অন্বেষণে নিরলসভাবে এগিয়ে গেছেন।

মাথায় আপেল পড়ার পর, আইজাক নিউটনের সেই আপেল গাছের তলায় বসে থাকতে পারতেন, কিন্তু তিনি তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে অধ্যবসায়ের সাথে গবেষণা চালিয়ে গেছেন। তারই ফল মহাকর্ষ সূত্র।

ম্যারি কুরি তেজস্ক্রিয়তার সত্য উন্মোচন করতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। বছরের পর বছর, অধ্যবসায়ের সাথে তিনি রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম আবিষ্কার করেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব এনে দেয়। এ যেন রমন মহর্ষি’র নিম্নোক্ত উক্তিটির প্রতিফলন, 

 চেষ্টা ছাড়া কেউ সফল হয় না। যারা সফল হয় তাদের অধ্যবসায়ের ঘাটতি থাকে না । 

আরেক বিজ্ঞানী, থমাস আলভা এডিসন হাজার ব্যর্থতার পরেও হাল ছাড়েননি। আর অবশেষে তার অধ্যবসায়ের ফল হয়েছে দীপ্তিময় বিদ্যুতের বাল্ব, যা আমাদের জীবনে আলো এনেছে।

কিন্তু অধ্যবসায়ের গল্প সবসময়ই সুখকর নয়। গ্যালিলিও সত্যের পথে অবিচারের মুখোমুখি হন, তাঁর অধ্যবসায় সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে।

রোজালিন ফ্রাঙ্কলিন প্রশংসা না পেলেও ডিএনএর গঠন আবিস্কারে অবিচল থাকেন। তাঁর অধ্যবসায়ের ফল পরবর্তীতে বিজ্ঞানের অনেক দরজা খুলে দেয়।

এই বিজ্ঞানীদের গল্প শেখায় যে অধ্যবসায় হল এক অদম্য শক্তি। এটি ব্যর্থতাকে জয় করে, অসম্ভবকে সম্ভব করে। 

অধ্যবসায় ও বাঙালি জাতি

বাঙালি জাতির ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে অধ্যবসায়ের সাথে। অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার এই অদম্য শক্তি আমাদের জাতিকে জুগে জুগে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় শক্তি জুগিয়েছে।

ক) ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই: প্রায় আড়াই শতাব্দীর ব্রিটিশ শাসন, অসহনীয় নির্যাতন, অর্থনৈতিক শোষণ – এর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অধ্যবসায় ছিল অবিচল। বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, আন্দোলন-সংগ্রাম করে, শেষ পর্যন্ত মাতৃভূমিকে মুক্ত করার অপার সাফল্য অর্জন করেছি আমরা।

খ) মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য: ১৯৭১ সালে আরও একবার অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালো বাঙালি জাতি। প্রশিক্ষণহীন গণবাহিনী , সীমিত অস্ত্র – সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু শত্রুর কাছে হার না মেনে, মাতৃভূমিকে রক্ষার অঙ্গীকার, এবং স্বাধীনতার প্রতি অপার আকাঙ্ক্ষা – এই অধ্যবসায় আমাদের বিজয় এনে দিয়েছে। ৯ মাসের রক্তাক্ত যুদ্ধে, অসংখ্য শহীদের ত্যাগে, আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতার সাফল্য।

অর্থনৈতিক সাফল্যে: অভাব-অনাচারের মধ্যে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ, আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে চলেছে দৃঢ়পদে। অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে, অধ্যবসায়ের সাথে কাজ করে, আমরা অর্জন করেছি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। 

তবে আমাদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন, অতীতের গৌরবের পাশে, অধ্যবসায়ের অভাব আমাদের কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে রেখেছে। দায়িত্ব জ্ঞানের অভাব, কাজে অবহেলা, হতাশা – এগুলি আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে। অতীতের গৌরবকে ধরে রাখতে, ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করতে, আমাদের প্রত্যেককে অধ্যবসায়ের সাথে কাজ করতে হবে। তাহলে, আমাদের স্বপ্নের দেশ আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে। 

উন্নত বিশ্ব ও অধ্যবসায় 

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ছিল ধ্বংসস্তূপ। অর্থনীতি ধ্বসে পড়েছিল, শহর-নগর ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু জাপানি জাতি হাল ছাড়েনি। তাদের অধ্যবসায়, শ্রমনিষ্ঠা, এবং উদ্ভাবনী শক্তি তাদের ঘুরে দারাতে সাহায্য করে। আজ, জাপান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি, এবং প্রযুক্তিতে বিশ্বনেতা।জাপানের মত, জার্মানিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসের কবলে পড়েছিল। অবকাঠামো ধ্বংস, শিল্প ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু জার্মানির মানুষ তার শক্ত মনোবল, শ্রমনিষ্ঠা, এবং অধ্যবসায়ের সাহায্য দেশকে পুনর্জীবিত করে। শিল্পে, উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনে, এবং রপ্তানি বাণিজ্যে জার্মানি এখন বিশ্বসেরা। জন কুইন্সি অ্যাডামস ভাষায় একে বর্ণনা করা যায়, 

ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ের একটি জাদুকরী প্রভাব রয়েছে যার আগে সমস্যাগুলি অদৃশ্য হয়ে যায় এবং বাধাগুলি লোপ পায়।  

১৯৭০-এর দশকে চীন ছিল একটি দরিদ্র, কৃষি-ভিত্তিক দেশ। কিন্তু আজ, চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি, উৎপাদন ক্ষেত্রে বিশ্বনেতা, এবং বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। যা তাদের অধ্যবসায়ের ফলাফল।  

এই উদাহরণগুলো আমাদের শেখায় যে, যে কোনো পরিস্থিতিতে অধ্যবসায় থাকলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। কঠোর পরিশ্রম, উদ্ভাবনী চিন্তা, এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আমাদের জাতিকেও আরও উন্নত করতে পারে।

অধ্যবসায়ের অপব্যবহার 

অধ্যবসায়, নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক গুণ। এটি আমাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে, বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে শেখায়, এবং জীবনকে সার্থক করে তোলে। কিন্তু, অন্য যেকোনো শক্তির মতোই, অধ্যবসায়েরও একটি অন্ধকার দিক রয়েছে। যখন এটি নেতিবাচক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তখন এটি ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনতে পারে।

ইতিহাসে আমরা অধ্যবসায়ের ভুল ব্যবহারের নির্মম উদাহরণ দেখেছি। হিটলার তার অমানবিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অধ্যবসায়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যার ফলস্বরূপ ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর কলঙ্কিত গণহত্যা ঘটেছে। বিশ্বের অনেক দেশ বিপজ্জনক অস্ত্র বা পারমানবিক বোমা তৈরির মতো ধ্বংসাত্মক কাজে অধ্যবসায় ঢেলে দিয়েছে। এমনকি অনলাইনেও, অধ্যবসায় হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, অনেকেই বিরতিহীন ভাবে মেয়েদের উক্তাক্ত করে থাকে। আবার, অনেকসময় আমারা ক্ষোভের বশীভূত হয়ে কোন মানুষের ক্ষতি করতে উঠেপড়ে লাগি, এমন অধ্যবসায় কক্ষনই কাম্য নয়। 

তাই, আমাদের সচেতন হতে হবে। আমাদের অধ্যবসায়কে ইতিবাচক ও নৈতিক কাজে ব্যবহার করতে হবে, যাতে। 

অধ্যবসায়ী হয়ার উপায়

অধ্যবসায় একটি শক্তিশালী গুণ যা আমাদের জীবনে অনেক কিছু অর্জন করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু অধ্যবসায়ী হওয়া সহজ নয়। এটির জন্য কঠোর পরিশ্রম, সংকল্প এবং আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন।

ওয়াল্টার এলিয়ট বলেছেন, 

“অধ্যবসায় একটি দীর্ঘ দৌড় নয়; এটি একের পর এক ছোট দৌড়।” 

এই উক্তিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অধ্যবসায়ের জন্য আমাদের ধারাবাহিক ভাবে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমরা যদি একবারে অনেক দূর যেতে চেষ্টা করি, তাহলে আমরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ব এবং থেমে যাব। কিন্তু যদি আমরা ছোট ছোট লক্ষ্যগুলিতে মনোনিবেশ করি এবং সেগুলি অর্জনের জন্য পরিশ্রম করি, তাহলে আমরা দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারব।

উপসংহার 

সাফল্যের পথে বাধা বিপত্তির শেষ নেই। এ পথে চলতে আমাদের অসংখ্য বাঁক, খাদ, পাহাড় আর  অজানা বিপদের মোকাবিলা করতে হয়। প্রত্যেকটি লক্ষ্য অর্জনের পথে ছড়িয়ে আছে কঠিন পরীক্ষা, নৈরাশ্যের গভীর গহ্বর, আর হতাশার ঝঞ্ঝা। কিন্তু এই কঠিন পথকে মোহময় পুষ্পে সাজিয়ে তুলতে, আর লক্ষ্যকে স্পর্শ করার অদম্য ইচ্ছাকে অটুট রাখতে আমাদের প্রয়জন হয় অধ্যবসায়ের। অধ্যবসায় একটি অদম্য শক্তি, যে অসম্ভব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়।

Persistence is the twin sister of success.

অর্থাৎ, অধ্যবসায় সাফল্যর জমজ বোন। তাহলে চলুন, এবার ঝাঁপিয়ে পড়ি অধ্যবসায়ের গভীর সাগরে, অনুসরণ করি সেই অবিরাম সাধনার পথ, এবং আবিষ্কার করি সেই অদম্য শক্তিকে, যা আমাদের জীবনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

অধ্যবসায় রচনা – পিডিএফ 

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, তোমাদের সুবিধার্থে, রচনার পিডিএফ কপিটি দেওয়া হল। এখনই ডাউনলোড করে তোমারদের ফোনে/পিসিতে রেখে দাও। 

 

Scroll to Top