Dreamy Media BD

সুয়েজ খাল – ইতিহাস ও গুরুত্ব

সুয়েজ খাল

সুয়েজ খাল খননের কাজ চলে ১০ বছর ধরে। দশ বছর কাজ করার পর ১৮৬৯ সালে এই খালটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ইউরোপ এবং এশিয়ার জলপথ হিসেবে সুয়েজ খালটি ব্যবহার করা হয়। ঋতুভেদে এই খালের পানি বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়। যেমন: শীতকালে উত্তরে এবং গ্রীষ্মকালে দক্ষিণে এই খালের পানি প্রবাহিত হতে দেখা যায়। এই খালের পানির বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হওয়ার জন্য জোয়ার ভাটার ভূমিকা রয়েছে। 

এই খালের ব্যাপ্তি শুরু হয়েছে ভূমধ্যসাগরের পোর্ট আবু সাঈদে। আর শেষ হয়েছে লোহিত সাগরের (আল-সুওয়েজ) পর্যন্ত। এই খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেন একজন ফরাসি উদ্যোক্তা। তার নাম ফার্দিনান্দ দে লেসেপ্স। পূর্বে এই খালটি মূলত মিশরীয় সরকারের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু বিরোধের কারণে এই সম্পত্তির মালিকানা বদলেছে। এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা সুয়েজ খাল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব। চলুন তাহলে শুরু করা যাক।

সুয়েজ খাল কোথায় অবস্থিত 

সুয়েজ খাল একটি কৃত্রিম খাল। অর্থাৎ এই খালটি মানুষ কর্তৃক খনন করা হয়েছে। এই কৃত্রিম খালটি মিশরের সিনাই দ্বীপে অবস্থিত। পণ্য পরিবহনের জলপথের মাধ্যম হিসেবে ইউরোপ থেকে দক্ষিণ এশিয়া এর মধ্যে সুয়েজ খালটি ব্যবহার করা হয়। এই খালটি ১৯০.৩ মিটার দীর্ঘ। সুয়েজ খালে গভীরতা ৯০ মিটার পর্যন্ত। তবে খনন কার্য সম্পাদন হওয়ার সময় এই খালের দৈর্ঘ্য ছিল ১৬৪ মিটার। ওই সময়ে এই খালের গভীরতা ছিল মাত্র ৮ মিটার। 

এই খালটিকে একটি কৃত্রিম সামুদ্রিক খাল বলা হয়। সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর লোহিত সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। এই কৃত্রিম খালটি এশিয়া এবং আফ্রিকাকে আলাদা করেছে। যারা আরব সাগর থেকে লন্ডন পর্যন্ত জলপথে যেতে চান তাদের যাত্রা দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৯০০ কিলোমিটার কমে গেছে সুয়েজ খালের মাধ্যমে।

এই যাত্রা সময় সুয়েজ খাল ব্যবহার করলে প্রায় ৮ দিন সময় বেঁচে যায়। এই খালটির দৈর্ঘ্য শুরু হয়েছে পোস্ট সৈয়দের উত্তর টার্মিনাস থেকে। এবং এই খালটি সুয়েজ শহরের দক্ষিণ টার্মিনাস পর্যন্ত বিস্তৃত। এই খালটির উপর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫১ টি জাহাজ অতিক্রান্ত হয়।

সুয়েজ খালটি মিশরের সিনাই দ্বীপে অবস্থিত। বিভিন্ন হিসাব মতে, সুয়েজ খালটি সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এটি মানুষ প্রত্যেক সৃষ্ট একটি কৃত্রিম জলাধার। এটাকে একটি কৃত্রিম সামুদ্রিক খাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরকে একত্রিত করার জন্য সুয়েজ খালটি একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে এককথায় বলতে গেলে সুয়েজ খালটি আফ্রিকা এবং এশিয়ার মধ্যস্থানে অবস্থিত। এবং এই খালটি দুটি মহাদেশকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা করেছে। 

এই খালটি তিনটি বড় হ্রদ কেও একত্রে সংযুক্ত করে। এগুলো হলো: লেক মানজালা, বিটার লেকগুলো এবং তিমসাহ হ্রদ। আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশের মধ্যে এই সুয়েজ খালটি একটি সংযোগসেতু হিসেবে কাজ করে। এই খালটি মিশরের সাঈদ সমুদ্র বন্দর এর কাছাকাছি অবস্থিত। এই খালতে যেহেতু ইউরোপ এবং আফ্রিকাকে আলাদা করেছে তাই জনগণের দক্ষিণ আটলান্টিক হয়ে এশিয়া পৌঁছানোর ঝামেলার অনেকটা অবসান ঘটে। এই খাল খনন করার মাধ্যমে মিশরের বন্দর সাঈদ এবং তেউফিক এই দুইটি বন্দরের মাঝে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়।

suezcanalmap
suezcanalmap

সুয়েজ খাল জাতীয়করণ

সুয়েজ খালটি খননের সময় এটি ছিল মিশরীয় সরকারের সম্পত্তি। এটি 1956 সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। পরবর্তীতে খালটি ইউরোপীয় অংশীদাররা দাবি করেন। ইউরোপীয় অংশীদাররা ব্রিটিশ এবং ফরাসি সংস্থার মালিকানার মাধ্যমে এই খালটির রক্ষণাবেক্ষণ করতেন।

তখনকার মিশরের রাষ্ট্রপতির নাম ছিল জামাল আব্দেল নাসের। তিনি মিশরের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৫৬ সালে এই খালটি জাতীয়করণ করেন। কিন্তু জাতীয়করণ করার পর থেকে সুয়েজ খালের বিভিন্ন রকমের সংকট দেখা যায়। 

১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সুয়েজ খালটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সুয়েজ খাল ছিল আরব ইসরাইল যুদ্ধের একমাত্র ক্ষেত্র। পরবর্তীতে জানা যায় সুয়েজ খাল প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল কূটনৈতিক ফার্দিনান্দ দে লেসেপস। তিনি এক বক্তিতায় বলেছিলেন ”  সুয়েজ খাল কোন দেশের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়”। তাই এই খালটির উপর কোন জাতির বিশেষ অধিকার থাকতে পারে না।

মিশরের তৎকালীন জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট  জামাল আব্দেল নাসের খালটির পরিচালনাকারী সংস্থার কাছে কোম্পানির জাতীয়করণ করেন। বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হলেও এই সিদ্ধান্তটি বর্তমানে বলবৎ রয়েছে।

সুয়েজ খাল জাতীয়করণ কবে করা হয়

বিভিন্ন তথ্য অনুসারে জানা যায় সুয়েজ খালটি ১৯৫৬ সালে জাতীয়করণ ঘোষণা করা হয়েছে। মিশরীয় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক খালটির জাতীয়করণ ঘোষণা করা হয়। তবে জাতীয়করণ করার পর থেকে বিভিন্ন সমস্যার কারণে পরবর্তীতে সুয়েজ সংকট দেখা যায়। কারণ প্রথমত এই খালটি খননের সময় মালিকানায় যে ছিল পরবর্তীতে তার কাছ থেকে সুয়েজ খালটি জাতীয়করণ করা হয়।

সুয়েজ খাল সংযুক্ত করেছে

খননের পর থেকে সুয়েজ খালটি একটি জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই খালটি ব্যবহার করে যারা পণ্য আনা নেওয়া করেন তাদের পণ্য নেওয়ার ক্ষেত্রে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে আসতে হয় না। এই খালটি খুলে দেওয়ার আগ পর্যন্ত পণ্য জাহাজ থেকে নামানোর পর মিশরের স্থল পথ দিয়ে অতিক্রম করতে হতো।

পরবর্তীতে ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগরে এবং লোহিত সাগর থেকে ভূমধ্য সাগরের মধ্য দিয়ে এইসব পণ্য আনয়ন করা হতো। খননের পর থেকে এই খালটি লোহিত সাগরের সাথে ভূমধ্যসাগরকে একসঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এই কৃত্রিম সামুদ্রিক খালটি ১৮৬৯ সালে সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়।

aerial view of suez canal
aerial view of suez canal

সুয়েজ খাল কে খনন করেন

খ্রিস্টপূর্ব ১৮৯৭ থেকে ১৮৩৯ সালের মাঝামাঝি এই খালের খনন কাজ শুরু হয়। এই সময়ে এই খালটির খননকাজ শুরু করেন রাজা দ্বিতীয় নিকো। কিন্তু কাজ শুরু করার পর তিনি অনুমান করেন এই খালটি পরবর্তীতে মিশরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই তিনি ওই সময়ে এই খালটার খনন কাজ বন্ধ করে দেন। তবে পরবর্তীতে আধুনিক সুয়েজ খাল এর মূল প্রকৌশলী ছিলেন ফারদিনান্দ দি লেসেন্স। আধুনিক প্রকৌশলীরা মিলে এই খালটি খনন কাজে দায়িত্ব নেন। সুয়েজ খাল খননের যাত্রা শুরু হয়‌ ১৮৫৯ সালের ২৫ এপ্রিল।

মিশর সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেছিল কত সালে

খননের পর থেকে সুয়েজ খাল ছিল মিশরীয় সরকারের একান্ত সম্পত্তি। তবে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ব্রিটিশরা এবং ফরাসিরা এই সম্পত্তির মালিক ছিল। এই খালটি তারাই পরিচালনা করত। কিন্তু পরবর্তীতে মিশরের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জামাল আবদেল নাসের খালটির জাতীয়করণ ঘোষণা করেন। জাতীয়করণ ঘোষণার ফলে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয় যার পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরেরই অক্টোবর – নভেম্বর মাসে সুয়েজ সংকট দেখা দেয়।

সুয়েজ খালের দৈর্ঘ্য কত

সুয়েজ খালের পরিসীমা শুরু হয়েছে পোর্ট সৈয়দের উত্তর টার্মিনাস থেকে। আর এটি শেষ হয়েছে সুয়েজ বন্দরের দক্ষিণ টার্মিনাস পর্যন্ত। উত্তর এবং দক্ষিণ সম্পূর্ণ পরিসীমা নির্ধারণ করলে এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ১৯৩.৩০ কিলোমিটার। যার অর্থ এটি হলো ১২০.১১ মাইল। বিভিন্ন খান অনুযায়ী, ২০২০ সালে এই খালের উপর দিয়ে ১৮ হাজার ৫০০ টি জাহাজ চলাচল করেছে। প্রতিদিন হিসাব করলে ৫১ টি জাহাজ চলাচল করে।

সুয়েজ খাল কোন বছর চালু হয়

আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি ১৮৫৯ থেকে ১৮৬৯ সাল অর্থাৎ ১০ বছর ধরে এই খালটির খনন কাজ চলেছে। খালটির খনন কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত হওয়ার পর ১৮৬৯ সালের ১৭ ই নভেম্বর খালটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তারপর থেকে এই খালটি একটি জলপথ হিসেবে প্রতিনিয়ত জাহাজ আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

সুয়েজ খালের ইতিহাস

সুয়েজ খালটি প্রধানত সিল্ক রোডের অংশ। এবং এই খালটি ইউরোপ কে এশিয়ার সাথে একসঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে সুয়েজ খালের নাম প্রথমেই চলে আসে। একসময় ইউরোপ থেকে আফ্রিকা আসার জন্য সমুদ্রপথে সাত হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো জাহাজগুলোকে।

এই খালটি তৈরি হওয়ার পর থেকে সময়ের সাথে সাথে অর্থ ব্যায় এর পরিমাণ কমে আসে। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী সমুদ্র বাণিজ্যের ১০ শতাংশ জাহাজ সুয়েজ খালার উপর দিয়ে যাওয়া আসা করে। তাই এই খালটি একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন।

উপসংহার

বর্তমান সময় পর্যন্ত সুয়েজ খালটি নানা সংঘাতে সাক্ষী বহন করে চলেছে। বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত উপেক্ষা করে সুয়েজ খাল ১৫০ বছরে পা দিতে চলেছে। এই খালটি খননের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে সংযুক্ত করা। 

যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি আনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমান সময় পর্যন্ত এই খালটি ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে সংযুক্ত করে রেখেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সুয়েজ খাল থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৯০ কোটি মার্কিন ডলার। জলপথ হিসেবে এই খালটি ১৮৬৯ সাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

আরো পড়ুন –

Related Post

খুশির স্ট্যাটাস

200+ স্টাইলিশ খুশির স্ট্যাটাস | হাসি নিয়ে ক্যাপশন

খুশির স্ট্যাটাস | হাসি নিয়ে ক্যাপশন জীবনের সুন্দর খুশির মুহূর্ত আমরা সবাই বাঁধাই করে রাখতে চাই। আর এই খুশির মুহূর্তকে ধরে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায়

Read More »
❤love status bangla | ভালোবাসার ছন্দ | রোমান্টিক ছন্দ | প্রেম ছন্দ স্ট্যাটাস❤

স্টাইলিশ ভালোবাসার ছন্দ | রোমান্টিক ছন্দ | Love Status Bangla

❤❤ভালোবাসার ছন্দ | ভালোবাসার ছন্দ রোমান্টিক | ভালোবাসার ছন্দ স্ট্যাটাস❤❤ ভালোবাসা হলো এক অন্যরকম অনুভূতির নাম, যা শুধুমাত্র কাউকে ভালবাসলেই অনুভব করা যায়। আমরা বিভিন্নভাবে

Read More »
মন খারাপের স্ট্যাটাস

মন খারাপের স্ট্যাটাস, উক্তি, ছন্দ, ক্যাপশন, কিছু কথা ও লেখা

মন খারাপের স্ট্যাটাস মন খারাপ – এই কষ্টের অনুভূতি কার না হয়? সবারই কখনো না কখনো সবারই মন খারাপ হয়। জীবনের ছোটোখাটো অঘটন থেকে শুরু

Read More »
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলা হয় বিশ্বকবি। তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও গুনী লেখক। প্রেম চিরন্তন এবং সত্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালীর মনে প্রেমের

Read More »
ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা

ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা | Breakup Status Bangla

ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা আপনি কি আপনার প্রিয়জনের সাথে সম্পর্ক থেকে বের হয়ে এসেছেন? আর সেটা আপনি কোন ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা মাধ্যমে বোঝাতে চাচ্ছেন। তাহলে আপনি

Read More »

Leave a Comment

Table of Contents