Dreamy Media BD

ওড়িশার দর্শনীয় স্থান

কোণার্ক মন্দির 

পূর্ব ভারতের একটি রাজ্যের নাম ওড়িশা। পর্যটকদের কাছে একটি প্রসিদ্ধ ও ঐতিহ্য বাহী স্থানের নাম ওড়িশা।এই রাজ্যের প্রধান ভাষা ওড়িয়া। মন্দিরের রাজ্য বলা হয় ওড়িশা রাজ্যকে। নানারকম আশ্চর্য স্থাপত্য শৈলী ,নৃত্য এবং মন ভুলানো গানের জন্য ওড়িশা রাজ্য বহুল পরিচিত।

মন মাতানো দর্শনীয় স্থানগুলো নিয়ে যেন উড়িষ্যা কে সাজানো হয়েছে। পাহাড়, সমুদ্র, সবুজ প্রান্তর, উষ্ণ আবহাওয়া, চোখ  ধাঁধানো আকর্ষণীয় ভ্রমণ স্পট কি নেই এখানে? সব নিয়ে সাজানো ওড়িশা রাজ্য যেন আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। দেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণ করতে কার না ভালো লাগে? ভ্রমন পিপাসু মন যখন ছুটে যেতে চায় কোন অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে আর সেটা যদি হয় দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ কার না যেতে মন চাইবে বলুন?

ছুটির অবসর টাইমটা যদি কোন অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে কাটানোর কথা চিন্তা করেই ফেলেন তাহলে বলবো নির্দ্বিধায় চলে যেতে পারেন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ পূর্ব ভারতের ওড়িশা রাজ্যে। ভারতের এই রাজ্যটি সাজানো রয়েছে নানান গল্পকথার চোরাবালি দিয়ে।

আপনার মনের মতন স্থান যেখানে গেলে আপনি উপভোগ করতে পারবেন যা চেয়েছিলেন তার থেকে বেশি আর অবসর সময় গুলো কোথায় কিভাবে কাটানো যায় যেখানে গেলে আপনার এক মুহূর্তের জন্য মনে হবে না আপনার ভ্রমণটা বৃথা গেছে, তার জন্য সবসময় আমাদের নতুন নতুন আয়োজন থাকে। আমাদের এবারের আয়োজন ভারতের ওড়িশা রাজ্যকে নিয়ে আপনাদের জন্য রয়েছে সম্পূর্ণ গাইডলাইন।

লোকেশন ভ্রমণ গাইড/ কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সড়ক পথে কিংবা রেলপথে দুই দিক থেকে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা যেতে পারেন।

কলকাতা থেকে আপনি ট্রেন যোগে অথবা সড়কপথে বাসে করে ওড়িশা রাজ্যে প্রবেশ করতে পারেন।

উড়িষ্যা রাজ্যের পুরী থেকে গাড়ি, ট্যাক্সি কিংবা অটোতে করে খুব সহজেই কোণার্ক সূর্য মন্দির যেতে পারবেন। 

ভারতীয়দের জন্য প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৪০ রুপি এবং বিদেশিদের জন্য ৬০০ রুপি।

সপ্তাহের ৭ দিন খোলা থাকে এই মন্দিরটি। 

 ১.কোণার্ক মন্দির 

মুসলমানদের জন্য রয়েছে মসজিদ, বৌদ্ধ ধর্মের জন্য রয়েছে প্যাগোডা, খ্রীষ্টানদের জন্য রয়েছে গীর্জা  তেমনি হিন্দুদের জন্য রয়েছে মন্দির। উড়িষ্যা রাজ্যের দারুণ সুন্দর, নিঃসর্গের মায়ায়, সভ্যতার আলোয়, ইতিহাসের গরিমায়, ঐতিহ্যের শীর্ষে কোণার্ক সূর্য মন্দির অবস্থিত। কোণার্ক সূর্য মন্দিরের অপর নাম- ব্ল্যাক প্যাগোডা বা কালো মন্দির। উড়িষ্যা রাজ্যের পুরীতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গন্তব্যস্থল হল এই কোণার্ক সূর্য মন্দির। এটি শুধু মাত্র মন্দির নয় প্রাচীন ভারতের সভ্যতা, সংস্কৃতি, সমাজ-বিজ্ঞান সবকিছুর আয়না। 

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি খুবই পবিত্র স্থান। তাদের স্বর্গ রাজ্য এই মন্দির বলে মনে করে অনেকেই। বিশেষজ্ঞদের মতে এই মন্দিরের দেওয়াল গুলো কথা বলে কথা বলে। কথা বলে, তার অপূর্ব শিল্পকলা। প্রতিটি মূর্তির চিন্তাধারা এই আধুনিক যুগের প্রত্যেকটি মানুষকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। মন্দিরটির এই শিল্প ধারার বহিঃপ্রকাশ দেখে দিনে দিনে এটি উড়িষ্যা রাজ্যের হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। হিন্দু পুরাণের গল্প কথা ঘিরে হাজারো রহস্যের জটলা পাকিয়ে রয়েছে এই মন্দিরের ইতিহাস। 

মন্দিরের সামনের রয়েছে একটা সমুদ্র। সমুদ্রে যাতায়ত করা সমুদ্র যাত্রীরা এই মন্দিরটিকে “ব্লাক প্যাগোডা” বলে ডাকতেন। লোক মুখে শোনা এর মূল কারণ হচ্ছে এই মন্দিরে চূড়ায় ছিল একটি ৫২ টন চুম্বক যার ফলে সমুদ্রে যাতায়াত কত জাহাজ চুম্বকের টানে তীরে চলে আসত এবং ধ্বংস করে দিত। এই মারাত্মক মারন শক্তির চুম্বকের জন্যই এর নাম ব্লাক প্যাগোডা বা কালো মন্দির বলা হতো। আরো বলা হয় এই কারনেই নাবিকরা ক্ষীপ্ত হয়ে চুম্বকটি ধ্বংস করে দিয়েছিল। লোকমুখে শোনা এমন গল্প গুচ্ছ অনেকেই বিশ্বাস করে আবার অনেকেই করে না। 

এই মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে লাল বেলে পাথর এবং কালো গ্রানাইট পাথর দিয়ে। এই সৌন্দর্য মন্ডিত মনোরম মন্দিরটিতে দর্শনের উদ্দেশ্যে বহু দূর দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসে। কোণার্ক সূর্য মন্দিরের প্রবেশদ্বারের দুই পাশে রয়েছে দুটি রাজ সিংহ মূর্তি যার নিচে আছে হাতি ও তার নিচে আছে মানুষ। এটা দ্বারা বোঝানো হয়েছে সিংহ হচ্ছে শক্তির প্রতীক, হাতি সম্পদের প্রতীক এবং আর মানুষ শক্তি ও সম্পদের নিচে পড়ে পিষে মারা যাচ্ছে। এমন চিন্তা শক্তি সত্যি আমাদের আধুনিক যুগের মানুষের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। 

মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে রথের আকৃতিতে। পুরো মন্দিরটি এতোটাই চিন্তা শক্তি মিশিয়ে বানানো হয়েছে যে এতোটা গভীর চিন্তা এখানকার কেউ করে না। কোণা মানে- “দিক” আর অর্ক মানে হচ্ছে- “সূর্য”। এই দুইটি কথা একত্রে হয়েছে কোণার্ক। অথাৎ এই মন্দিরটি সূর্য দেবতাকে সমর্পিত। তাই এই মন্দিরের প্রত্যেকটি অংশকে তৈরি করা হয়েছে সূর্যের বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে। তখনকার দিনে না ছিল সিমেন্ট না ছিল রোড তারপরেও এত নিখুঁত করে মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে যা সত্যিই চমৎকার। 

মন্দিরের নিচ থেকে শুরু করে চূড়া পর্যন্ত রয়েছে প্রতিটি স্থানের ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন পাথরের ভাস্কর্য ও কারুকার্য। দেবদেবীর মূর্তি, পাখির মূর্তি, পশুর মূর্তি, পৌরাণিক কাহিনী, নিত্যরত দেবীদের মূর্তি, এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মূর্তি যেগুলো বর্তমান যুগের প্রত্যেকটি জিনিসকে ইঙ্গিত করে। মন্দিরে গেলেই আপনি কিছু না কিছু জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। নিখুঁত কারিগর দ্বারা নির্মিত এই মন্দিরটি ধ্বংসাবশেষের পরেও আজও মানুষের কাছে এক পবিত্র স্থান হিসেবে রয়েছে সবার মনের মাঝে।  

আপনি যদি হিন্দু ধর্মের ইতিহাস প্রেমী হন তাহলে একবার হলেও ঘুরে আসতে পারেন উড়িষ্যার কোণার্ক সূর্য মন্দিরে। আশা করি আপনি অনেক কিছুই জানতে পারবেন এই মন্দির থেকে। 

লোকেশনভ্রমণ গাইড/ কিভাবে যাবেন 
পুরী থেকে কোণার্ক সূর্য মন্দিরের সড়ক পথের দূরত্ব ৩৪ কিলোমিটার। 

যেতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টার মতো। 

উড়িষ্যা রাজ্যের পুরী থেকে গাড়ি, ট্যাক্সি কিংবা অটোতে করে খুব সহজেই কোণার্ক সূর্য মন্দির যেতে পারবেন। 

ভারতীয়দের জন্য প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৪০ রুপি এবং বিদেশিদের জন্য ৬০০ রুপি।

সপ্তাহের ৭ দিন খোলা থাকে এই মন্দিরটি। 

২.ধ্যৈজগন্নাথ মন্দির 

উড়িষ্যার পুরী গেলে কেউ জগন্নাথ মন্দির দেখতে যায় না এমন লোক খুজে পাওয়া যায় না। ভারতের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক মন্দিরের মধ্যে জগন্নাথ মন্দির অন্যতম। হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে এটি একটি খুবই পবিত্র স্থান। উড়িষ্যা পুরীতে না গেলে বাঙালির ষোল কলা পূর্ণ হয় না। আর পুরিতে এসে জগন্নাথ মন্দির না দেখে কেউ যাওয়ার কথা কল্পনাতেও আনে না। জগন্নাথ মন্দিরের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাসের গরিমা শিল্পকলা আর রহস্যের মাখামাখি আছে। 

জগন্নাথ মন্দিরের পূর্ব দরজাকে মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার বা সিংহ দরজা বলে। এমনিতেই জগন্নাথ মন্দিরে মোট চারটি প্রবেশপথ রয়েছে। এই সিংহ দরজার রয়েছে একটি রহস্য। যদি কেউ এই সিংহ দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তখন সে ঢেউয়ের আওয়াজ শুনতে পায়। অবাক করা বিষয় হচ্ছে কেউ যদি আবার ঘুরে পিছন দিকে এসে একই রাস্তা দিয়ে যায় তাহলে আর সেই শব্দ শোনা যায় না। আর কোনো ভাবেই সেই আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় না। পুরো মন্দির ঘুরলেও সেই আওয়াজ আর পাওয়া যাবে না। 

মন্দিরে ভক্তদের লাইনের পর লাইন পড়ে যায়। পূজার থালা হাতে নিয়ে খালি পায়ে ভক্তরা এগিয়ে আসে পূজা দেওয়ার জন্য। সিংহ দুয়ার দিয়ে প্রবেশ করে প্রথমেই গরুড় স্তম্ভ দেখা যায়। ভক্তরা পূজা দেওয়ার সময় প্রথমেই আগে গরুড় স্তম্ভে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম জানাই। অনেকেই আবার গরুড় স্তম্ভ জড়িয়ে ধরে কারন এইটাই তাদের রীতি। গরুড় স্তম্ভে সর্বদা প্রদীপ জ্বালানো থাকে। এ ছাড়াও স্ট্যাম্বের উপর অনেক গুলো প্রদীপ আছে। উৎসব পার্বনে সব প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয় চারিদিকে আলোয় আলোকিত হয়ে যায়। এই দৃশ্য বলে বোঝানোর মত নয় এতটা মনমুগ্ধকর।

সেই ধাতব প্রদীপ গুলোতে উৎসবের সময় কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর পুরোহিতদের তেল বা ঘি ঢালতে হয় যেনো সব সময় মন্দিরটি প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে থাকে। বলা রাখা ভালো গরুড় স্তম্ভের কাছে দাঁড়ালে মন্দিরের ভেতরে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি স্পষ্ট দেখা যায়। পুরানে আছে,  শ্রীচৈতন্য স্বয়ং গরুড় স্তম্ভের নিকট দাঁড়িয়ে ভগবান দর্শন করতেন। সে কারণেই ভক্তদের কাছে এটি অতীব পবিত্র স্থান। মন্দির খুব সকাল সকাল খোলার হয়। মন্দির খোলার পর পরই জয় জগন্নাথ ও হরিবল শব্দে চারিদিকে জয়ধ্বনি শোনা যায়। 

এই জয়ধ্বনি শুনতে ভক্তরা চেষ্টা করে মন্দিরের সকাল সকাল যাওয়ার জন্য। মন্দিরে দর্শন করতে এত ভিড় হয় যে ভক্তদের লাইন দিতে হয়। মন্দিরের ভিতরে অধিক ভক্তদের আনাগোনা থাকার কারণে কোলাহল হলেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় না কখনোই। জগন্নাথ দর্শন এর সময় পুরোহিত মশাই ভক্তদের চরণামৃত দেয়। আর যদি কেউ পুরোহিতকে দক্ষিণা দেয় তখন সে ভক্তদের গলায় একটি জগন্নাথের হলুদ রঙের কাপড় বেঁধে দেয়। উড়িষ্যার পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দির চারটি ধামের একটি ধাম। এবং এটি বাকি তিনটি ধামের থেকে সবথেকে উৎকৃষ্ট ধাম। 

জগন্নাথ মন্দিরের ভিতরে শুধুমাত্র জগন্নাথের মূর্তি স্থাপিত নয় আরো অনেকগুলো দেবদেবীর মূর্তি আছে আপনি চাইলেই সেখান থেকে পূজা দিয়ে আসতে পারেন। প্রত্যেকটি দেবদেবীর মূর্তি আলাদা আলাদা মন্দিরে অবস্থিত। যেমন লক্ষ্মী মন্দির, গনেশ মন্দির, মহাদেব মন্দির ইত্যাদি আরো অনেক মন্দির রয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরের সবথেকে বেশি ভিড় হয় রথযাত্রা অনুষ্ঠানে। রথযাত্রার পুরো পুরী শহরের মানুষ এক হয়। এবং মহা ধুমধাম করে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। তবে রথ যাত্রার আগে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে স্নান করানো হয় যেখানে সেটিকে স্নান বেদী বলা হয়। 

এই স্নানযাত্রার পরে ভগবান অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবং এই অসুস্থতার কারণে ১৫ দিন একটানা ঘরবন্দী থাকে তখন জগন্নাথ দর্শন ভক্তদের জন্য বন্ধ থাকে। প্রভুকে সুস্থ করার জন্য বিশেষ পদের খাবার তার জন্য সযত্নে তৈরি করা হয়। তিনি শুরু হলেই বড় করে রথ সাজিয়ে রথযাত্রা অনুষ্ঠান উদযাপিত করা হয়। 

মন্দিরের ভিতরে অনেকগুলো প্রসাদের দোকান রয়েছে। আপনি যদি মন্দিরে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তাহলে সেখান থেকে আপনি খাবার কিনে খেতে পারবেন। ১২ টার সময় জগন্নাথ কে প্রসাদ নিবেদন করে তারপর সেই খাবার স্নান বেদীর পাশে আনন্দবাজারে দিয়ে দেয় । 

শাক, সবজি, ভাত, ডাল, চাটনি, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, ফল সব কিছুই আনন্দবাজার থেকে আপনি কিনতে পারবেন। জগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদ নিয়ে বহু পৌরাণিক কাহিনী শোনা যায়। যেমন- মাটির হাড়িতে সমস্ত খাবার ও কাঁচা শাক সবজি একটার পর একটা মোট দশটা হাড়ি চাপানো হয় এবং নিচে উনুন জ্বালানো হয়। সব থেকে মজার ব্যাপার হলো প্রথমেই যেই হাড়ির চাল সেদ্ধ হয় সেটি হলো একদম উপরের হাড়ি তারপর আস্তে আস্তে নিচে হাড়িগুলোর চাল সেদ্ধ হয় এবং একদম শেষে শেষের হাড়িটির চাল সেদ্ধ হয়। 

এটা জগন্নাথ মন্দিরের একটা অনেক আশ্চর্যের ঘটনা। সেখানে গেলে সব চেয়ে ভালো হয় যদি আপনি গাইড নেন। জগন্নাথ মন্দিরে রয়েছে অনেক গাইড বা পান্ডা। তাদের সাহায্যে আপনি পুরো জগন্নাথ মন্দির ঘুরে তথ্যাদি সংগ্রহ করতে পারবেন। আনন্দবাজার থেকে একটু এগিয়ে গেলেই দেখতে পারবেন শ্রীচৈতন্যের চরণের ছাপ। রয়েছে একটি খুব ছোট জলাশয়। বিমলা দেবীর মন্দিরের কাছেই আছে এই রোহিনী কুন্ড। জগন্নাথ মন্দিরে আরেকটি আকর্ষণীয় জিনিস হলো কল্পবট। ভক্তদের কাছে এটি একটি অতি পবিত্র গাছ। 

কারণ এই কল্পবটের অন্য নাম হলো ইচ্ছা পূরণের গাছ। অনেককাল ধরে এই গাছটি এখনো মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জগন্নাথ মন্দিরের ভেতরে। কিংবদন্তী, এই কল্প বটের পাতায় ঋষি কৃষ্ণের বাল্যকাল দেখতে পেয়েছিল। সেখান থেকে ভক্তদের এটি বিশ্বাস যদি শুদ্ধ চিত্তে মনে কোন ইচ্ছা পূরণ করতে চাওয়া হয় তাহলে অল্প বট তার ইচ্ছা পূরণ করে। যার কারণে সেখানে ভক্তদের প্রচুর ভিড় লেগে যায়। আপনিও এসে গল্প বটের অলৌকিক ক্ষমতা পরখ করে দেখতে পারেন। 

আপনি যদি পুরীতে আসেন অবশ্যই এই পবিত্র জগন্নাথ মন্দির দর্শনে আসবেন। বিশেষ করে আপনি যদি হিন্দু ধর্মালম্বীদের মধ্যে একজন হন তার এটি আপনার জন্য হবে শ্রেষ্ঠ একটি উপাসনালয়। পরিবার পরিজনকে নিয়ে উড়িষ্যার পুরীতে এলে ইচ্ছা পূরণের গাছের কাছে নিজের ইচ্ছা পোষণ করে দেখতে  পারেন।

লোকেশনভ্রমণ গাইড/ কিভাবে যাবেন 
উড়িষ্যা রাজ্য থেকে পুরী জগন্নাথ মন্দির ১১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। উড়িষ্যা থেকে প্লেনে করে আসতে চাইলে ভুবনেশ্বর বিমানবন্দরে নামতে হবে। সেখান থেকে পুরী ৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 

আপনি যদি ট্রেনে করে আসতে চান তাহলে প্রথমেই আপনাকে উড়িষ্যা থেকে হাওড়া বা শিয়ালদহে আসতে হবে সেখান থেকে খুব সহজে রাতের ট্রেনে সরাসরি পুরী স্টেশন চলে যেতে পারবেন।

পুরীতে পৌঁছে ট্যাক্সি বা গাড়িতে করে সরাসরি জগন্নাথ মন্দির দর্শনে যেতে পারবেন। 

Nandankanan Zoological Park
নন্দন কানন জুলজিক্যাল পার্ক

৩.নন্দন কানন জুলজিক্যাল পার্ক

 ভারতের বিখ্যাত ও বড়  চিড়িয়াখানার মধ্যে অন্যতম হলো নন্দনকানন জুলজিকাল পার্ক। প্রকৃতি প্রেমিকদের জন্য প্রাকৃতিক বনের ভেতরে দেশের অন্যদের থেকে ভিন্ন আয়োজনে সজ্জিত করা হয়েছে এই পার্কটি। অন্যান্য চিড়িয়াখানার পশু পাখিরা বন্দী অবস্থায় থাকার কারণে তাদের জীবনের সমস্ত স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে শুধুমাত্র ভারতের এই নন্দনকানন জুলজিক্যাল পার্কটিতে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে কোন ভয় ছাড়াই। 

সত্যি তাদের এই মুক্তচিন্তাধারার কারনে তাদের প্রতি সম্মান জানায় পুরো উড়িষ্যা বাসীর তরফ থেকে। নন্দনকানন বিশ্বের প্রথম চিড়িয়াখানা যেখানে সাদা বাঘের বংশবৃদ্ধি হয়। এখানে আরো অবাক করা বিষয় হলো চিতা বাঘের জন্য রয়েছে একটি খোলা প্রান্তর। তারা সেখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে। চিড়িয়াখানায় জলহস্তি এবং ঘড়িয়ালদের জন্য রয়েছে একটি বড় পুলের ব্যবস্থা। সেখানে তারা বংশবৃদ্ধি করে।

চিড়িয়াখানার ভিতরে ঢোকার পরে প্রথমে যেটা চোখে থাকে সেটি হল একটি বড় পানির ফোয়ারা। ফোয়ারার পাশেই একটি উঁচু স্থান যেখানে বাঘ মামাদের কিছু ভাস্কর্য আছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে তারা যেনো আড্ডায় মেতে উঠেছে তারা। একটু এগিয়ে গেলেই দেখতে পাবেন অনেকগুলো ব্যাটারি চালিত গাড়ি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি পুরো চিড়িয়াখানার ৫ কিলোমিটার পথ ঘুরতে পারেন ব্যাটারি চালিত গাড়িতে। সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৮০ টাকা আর আপনি যদি বাসে করে ঘুরে আসতে চান সেই ক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৬০ টাকা করে। 

তবে বাসে করে গেলে আপনাকে পুরো জঙ্গল সাফারি ঘুরিয়ে আনবে। এই চিড়িয়াখানায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পশু পাখি যেমন: তোতা, ময়ূর, ইঁদুর হরিণ, চিতা বাঘ, বন বিড়াল, বেজি, পাহাড়ি ময়না, হনুমান, বানর, হাতি, ভাল্লুক, উটপাখি, সজারু, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ লেজযুক্ত ম্যাকাক, নীলগিরি লাঙ্গুর, ভারতীয় প্যাঙ্গোলিন ইত্যাদি এছাড়াও নানা প্রজাতির সরীসৃপ প্রাণী। এত প্রজাতির পশু পাখি দেখতে দেখতে আপনার পা ব্যথা হলেও মনের মধ্যে বাসনা পূর্ণতা পাবে না পুরো পার্কটি ঘুরে না দেখা পর্যন্ত। 

যেহেতু এই পার্কের সমস্ত পশুপাখি উন্মুক্তভাবে থাকে তাই তাদের জন্য বানানো আছে দোলনা ,ছোট ছোট ঘর তাদের খেলার জন্য আরো অনেক কিছুই রাখা আছে। নন্দনকানন জুলজিক্যাল পার্কটি শুধুমাত্র ছোটদের জন্যই নয় বড়দের জন্য একটি মুক্ত চিন্তাধারার শিক্ষা দেয়। প্রকৃতির মাঝে পশু পাখিদের বসবাসস্থান হওয়ায় তারা নিজের বন হিসেবে রাজত্ব করে বেড়ায় যা দেখতে সত্যিই চমৎকার। প্রত্যেকটি পশু পাখি জোড়ায় জোড়ায় সেখানে রয়েছে। 

তাই তারা নিজেদের সঙ্গীর সঙ্গে খেলাধুলা করে সর্বক্ষণ যা বাচ্চারা দেখলে খুবই খুশি হয়। নন্দনকানন জুলজিক্যাল পার্কটি শুধুমাত্র পার্কই নয়, এটি একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন। সরীসৃপ প্রাণীদের জন্য করা হয়েছে আলাদা একটি সরীসৃপ পার্ক। পার্কটির প্রবেশপথে রয়েছে বিশাল বড় একটি ডাইনোসরের ভাস্কর্য। সরীসৃপ পার্ক এর ভিতর শুধুমাত্র সরীসৃপ প্রাণী দ্বারা ভরপুর যেমন- সাপ, গিরগিটি, কচ্ছপ, কুমির ইত্যাদি। পার্কের একপাশে বড় বড় করে লেখা আছে আই লাভ নন্দনকানন। 

বাসে করে যখন আপনি জঙ্গল সাফারিতে বের হবেন তখন বাসের সামনে থেকে খোলামেলা ঘুরে বেড়াতে দেখতে পারবেন বাঘ, সিংহ ,ভাল্লুকের মতো ভয়ানক প্রাণী এছাড়াও আরো অনেক সুন্দর সুন্দর পশু, পাখি, প্রাণী ঘুরে ঘুরে বেড়াবে যা দেখতে সত্যিই চমৎকার। পার্কের একপাশে রয়েছে একটি বড় লেক। লেগে ঠান্ডা মৃদু বাতাস উপভোগ করার জন্য রয়েছে একটি বসার স্থান। সেখানে দাঁড়িয়ে অনায়াসে আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারেন নির্দ্বিধায়। এত বড় এরিয়া নিয়ে এই পার্কটি অবস্থিত যে আপনাকে পার্কটি ঘুরতে হলে পুরো দিনটাই লেগে যাবে। 

সেখানে রয়েছে আবার বোটিং এর ব্যবস্থা। এই বৃহত্তম চিড়িয়াখানার ও বনাঞ্চলের মজা নিতে একবার হলেও উড়িষ্যার নন্দনকানন জুলজিক্যাল পার্কটি ঘুরে দেখতে পারেন। এছাড়া বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি আনন্দিত করবে এই পার্কের সৌন্দর্য। তাই পরিবার পরিজন , আপনার বাড়ি সোনামণি কিংবা বন্ধু বান্ধব  কে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন এই সুন্দর নন্দনকানন জুলজিক্যাল পার্ক।

লোকেশনভ্রমণ গাইড/ কিভাবে যাবেন 
উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর থেকে পুরী ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 

পুরী থেকে নন্দনকানন ৭৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 

উড়িষ্যা থেকে নন্দনকানন পার্কে আপনি তিন ভাবে যেতে পারবেন

১. উড়িষ্যা ট্যুরিজম এর প্যাকেজ থেকে।

২. গাড়ি রিজার্ভ নিয়ে।

৩. নিজেদের বাইক করে। কিংবা ভাড়া করে। 

চিড়িয়াখানা প্রবেশ মূল্য পড়বে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে।

বাচ্চাদের জন্য ২০ টাকা প্রবেশ মূল্য। 

পার্কটি সোমবারে বন্ধ থাকে। বাকি দিনগুলোতে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। 

 পার্কটি সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে।

লিঙ্গরাজ মন্দির 
লিঙ্গরাজ মন্দির

৪.লিঙ্গরাজ মন্দির 

আগ্রার কথা মাথায় গেলে আমরা তাজমহলের কথা ভাবি, সেভাবেই পুরীতে গেলে জগন্নাথ মন্দির, দিল্লি গেলেই কুতুব মিনার আর ভুবনেশ্বর গেলেই লিঙ্গরাজ মন্দির। এর মানে ভুবনেশ্বর গেলে লিঙ্গরাজ মন্দির দর্শন করবে না এমন সনাতন ধর্মীয় কোন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। 

হিন্দুদের পুরাণে বর্ণিত আছে, একসময় একটি আম গাছের নিচে হরিহর, বিষ্ণু ও শিব একসাথে এক লিঙ্গে সবার কাছে পূজিত হতো। যেহেতু হরিহর, বিষ্ণু ও শিব স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের অধীশ্বর বা ত্রিভুবনেশ্বর সেই থেকে নাম হয় ভুবনেশ্বর। মূল লিঙ্গরাজ মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য মন্দির গুচ্ছ। 

উড়িষ্যাকে মন্দিরের রাজ্য বললে অত্যুক্তি করা হবে না। উড়িষ্যাতে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মন্দির সমূহ। তেমন একটি প্রাচীন মন্দির উড়িষ্যার লিঙ্গরাজ মন্দির। মন্দিরটি উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরের সবচেয়ে বড় মন্দির হওয়ায় হিন্দুদের সবচেয়ে বড় তীর্থ স্থান এটি।

 শিব ও বিষ্ণুর মিলিত ভাবে স্থাপিত মন্দির চিত্তে। এমন দুটি ভগবানের মিলিত রূপ অন্য কোন মন্দিরে দেখা যায় না সাধারণত। সে কারণেই মন্দিরটি সবার কাছে বেশি পরিচিতি লাভ করেছে। মন্দিরটি অনেক উঁচু। মন্দিরের চূড়া ১৮০ ফুট উপরে। হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে এটি একটি খুবই পবিত্র স্থান। উড়িষ্যা মন্দিরের হাট নিয়ে বসে আছে ভারতে।

মন্দিরের শহর ওড়িশা রাজ্য।

তাই তো সবাই মন্দির দর্শনের উদ্দেশ্যে উড়িষ্যাতে পাড়ি জমায়। দর্শনার্থীদের আনাগোনায় উড়িষ্যার বেশ কয়েকটি মন্দির হয়ে উঠেছে সেরা দর্শনীয় স্থান। সবচেয়ে বেশি দর্শনীয় মন্দির লিঙ্গরাজ মন্দির। যেকোনো উৎসব পার্বনে উড়িষ্যাতে পা রাখার জায়গা মেলায় দায়। বিশেষ করে উড়িষ্যাতে লিঙ্গরাজ মন্দিরে যখন শিবরাত্রির অনুষ্ঠান হয় তখন লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে সেখানে। 

আর সাধারণ দিনে হাজার খানিক লোকের সমাগম ঘটে এই মন্দির চত্বরে। এই লিঙ্গরাজ মন্দিরটি চারটি ভাগে ভাগ করা রয়েছে বিমান, জগমোহন, নাট্য মন্দির ও ভোগ মন্ডপ। জগমোহন থেকে বিমান ভাগ গুলো একটি থেকে অন্যটি কম উচ্চতায় নয় সবগুলোই ক্রমানুযায়ী বেড়েছে।

মন্দিরটি পুরোটাই দেওয়ালে ঘেরা। রাস্তা থেকে মন্দিরের ভেতরে দেখা যায় না এবং মন্দিরটির প্রতি ইঞ্চি নকশাকৃত স্থাপত্যের নিদর্শন বিদ্যমান। লিঙ্গরাজ মন্দিরের প্রবেশ দ্বারটি চন্দন কাঠের তৈরি। মূল ফটকের থেকে ভেতরে ঢুকলেই প্রথমেই দেখতে পাবেন মন্দিরের প্রথম অংশ “জগমোহন”  অর্থাৎ ভক্তদের জমায়েত হওয়ার জায়গা, আরেকটু এগিয়ে গেলে দেখতে পাবেন “নাটমন্দির” এই নাটমন্দির মূলত উৎসবের সময় ব্যবহার করা হয়, এরপর নাটমন্দিরের থেকে একটু ছোট “ভোগ মন্দির” পূজা দিতে আসা হিন্দুদের ভোগ নিবেদনের জায়গা এই ভোগ মন্দির। 

এরপর রয়েছে “বিমান” অংশ এটি মন্দিরের সব থেকে বড় অংশ এখানেই প্রতিষ্ঠিত করা রয়েছে হর-হরি লিঙ্গরাজ। মন্দিরটি তৈরি হয়েছে বেলে পাথর ও ল্যাটেরাইট (মাকড়া) পাথর দিয়ে। এই পুরো উড়িষ্যার কোনো মন্দিরের দেওয়ালে লিঙ্গরাজ মন্দিরের দেয়ালের মতো এরকম সূক্ষ্মতম ভাস্কর্য আর একটাও নেই। এই মন্দিরের মূল দেয়ালের গায়ে এক ইঞ্চিও এমন জায়গা পাওয়া মুশকিল যেখানে ভাস্কর্য নেই। প্রতিটা দেওয়াল জুড়ে ভাস্কর্যের ছড়াছড়ি। এমন নিপুন হাতের কাজ দেখতে যে কারোরই চোখ জুড়িয়ে যাবে। 

প্রাচীন এই মন্দিরটির বয়স অনেক হলেও তেমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এখনো তেমন হয়নি। অর্থাৎ আপনি যদি মন্দিরটিতে যান আপনার মন ভরিয়ে তুলতে সক্ষম এই লিঙ্গরাজ মন্দিরটি। পাথরের গায়ে জায়গা পেয়েছে মানুষ, পশুপাখি ও দেব-দেবীরা। ফাঁকা জায়গা গুলোতে জায়গা করে নিয়েছে সূক্ষ্ম নক্সা। সবথেকে ওপরে রয়েছে মাথায় উল্টানো কলস। এছাড়াও এই নাট মন্দিরের নারী পুরুষের যুগল মূর্তির ভাস্কর্য, নর্তকী রমণীর ভাষ্কর্য এবং মানব জীবনের নানান মুহূর্তের অঙ্কিত চিত্রায়ন সমূহ রয়েছে এই মন্দিরে। 

এই লিঙ্গরাজ মন্দিরে এতো মূর্তি, ভাস্কর্যের ভিতর মৈথুর মূর্তি একেবারে নেই। বিমানের অংশটি ধাপে ধাপে উপরে উঠেছে। জগমোহনের প্রবেশদ্বারেই রয়েছে, সামনের পায়ে বসে থাকা দুইটি রাজ সিংহ। যা দেখতে সত্যিই দৃষ্টি নন্দন। এছাড়াও মন্দিরের চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভোগ রান্নার জায়গা। দূর দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা এই ভোগ মন্দির থেকে ভোগ কিনে নিবেদন করে অনেকেই। এই লিঙ্গরাজ মন্দির ঘিরে সারা বছর উৎসবের খামতি নেই। আপনিও এই উৎসবের শামিল হতে পারেন। 

আর দেরি কিসের আজই বেরিয়ে পড়ুন উড়িষ্যার  ভুবনেশ্বরের সবচেয়ে বড় মন্দির দর্শনে। আপনি যদি আগে থেকেই মন্দির দর্শন করে থাকেন তাহলে নতুন করে আপনাকে বলার কিছু নেই এর সৌন্দর্যতা  সম্পর্কে। তবে আপনি যদি মন্দির দর্শনে প্রথম বার যেয়ে থাকেন তবে আপনার ভ্রমণ প্রিয় মনটি শান্ত হয়ে যেতে বাধ্য এতোটা সুন্দর মন্দিরটি। 

লোকেশনভ্রমণ গাইড/ কিভাবে যাবেন 
উড়িষ্যা থেকে খুব অল্প কিছু দূরেই লিঙ্গরাজ অবস্থা মন্দির টি অবস্থিত।লিঙ্গরাজ মন্দিরে যেতে গেলে উড়িষ্যা থেকে প্রথমেই আপনাকে ভুবনেশ্বর বাসস্ট্যান্ড নামতে হবে আর যদি ট্রেনে করে আসেন তাহলে ভুবনেশ্বর স্টেশন নামতে হবে। সেখান থেকে আপনি অটোরিকশা করে খুব সহজেই যেতে পারবেন মন্দির দর্শনে। 

৫.গোপালপুর সমুদ্র সৈকত

ভ্রমণ পিপাসু মন যখন সমুদ্র ভ্রমণের চিন্তা করে তখন প্রথমেই  দীঘা না হয় পুরী ভ্রমণের কথা আগে মনে আসে। কিন্তু নিরিবিলি স্থান আর নিজের মনের মত ঘুরাঘুরি করতে কার না ভালো লাগে? এমনই একটি স্থান যদি আপনি পেতে চান তাহলে অবশ্যই আপনাকে আসতে হবে পুরি থেকে দেড়শ কিলোমিটার দূরে উড়িষ্যা রাজ্যের দ্বিতীয় সমুদ্র সৈকত , সব থেকে জনপ্রিয় গোপালপুর সমুদ্র সৈকত বা গোপালপুর সী বিচ।

ওড়িশার সাগরবেলাগুলির মধ্যে অন্যতম গোপালপুর অন সি, বেরহামপুর স্টেশন থেকে ১৬ কিমি দূরে। নীল সাগরের বুকে নারকেল আর ঝাউগাছে ছাওয়া শান্ত-স্নিগ্ধ সৈকত। সোনালী বালুতটে সারাদিন ধরেই চলে জেলেদের মাছধরা। মাথার ওপর পাক খায় শঙ্খচিল। সমুদ্রে ভেসে বেড়ায় রঙবেরঙের পালতোলা নৌকো। তীরে বালির ওপরে রঙীন প্লাস্টিক আর গার্ডেন ছাতার তলায় পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানীরা।

শহর থেকে অল্পদূরে হলেও গোপালপুর সৈকত বেশ নির্জন। পুরীর সমুদ্রের মতো উত্তাল না হলেও স্নান করতে ভাল লাগে। তবে এখানে নির্দিষ্ট স্থানে স্নান করা উচিত। সমুদ্রের উঁচু-নিচু বালিয়াড়ি ছাড়াও বেশকিছু জায়গা পাথরে ভরতি। জলে আন্ডারকারেন্টও আছে। স্নান করার সময় সতর্ক থাকা ভাল।

সি-বিচের একপাশে লাইটহাউসটি বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ১৩৫ ফুট উঁচু এই লাইটহাউসে ১৫৫টি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হবে। লাইটহাউসের থেকে গোপালপুরের বিস্তীর্ণ সাগরবেলা আর অপরূপ সূর্যাস্ত মুগ্ধ করে মনকে। অতীতে এখানে বন্দর ছিল। আজও রাতের বেলায় সমুদ্রে পথ দেখায় লাইটহাউসের আলো।

সৈকতের কাছাকাছি পায়ে হাঁটা দূরত্বে গোপালকৃষ্ণ মন্দির। দেবতা শ্রীবেণুগোপাল স্বামীভারণা। পিতলের গোলাকার থামসহ অন্যান্য কারুকার্য ভারি সুন্দর। গোপালজির নামেই এ শহরের নামকরণ বলে অনুমান করা হয়। কাছাকাছি দেখার মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির, কোকোনাট গার্ডেন, ধবলেশ্বর মন্দির, ভিনসেন্ট চার্চ, হিল টপ ভিউ, গোপালস্বামী কৃষ্ণমন্দির, লাইটহাউস, কাজুবাদাম কারখানা অন্যতম।

 খাঁড়িপথে ব্যাকওয়াটার ভ্রমণ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। গোপালপুর থেকে কন্ডাক্টেড ট্যুরে বা গাড়ি ভাড়া করে সারাদিনে বেশ কয়েকটা জায়গা বেড়িয়ে নেওয়া যায়। নির্মলঝর, নারায়ণী মন্দির, চিল্কা, রম্ভা, বরকুল। এছাড়া তপ্তপানি, চন্দ্রগিরি পর্বত একদিনের প্রোগ্রামে ও আরেকদিন তারাতারিণী বেড়িয়ে নেওয়া যায়। আর আছে ৩০ কিলোমিটার দূরে পাতিসেরনপুর সমুদ্রসৈকত ও ৩২ কিলোমিটার দূরে রুশিকন্যা নদীর মোহনা।

নদী আর সমুদ্রের সঙ্গমে কাজুবাদাম গাছে ছাওয়া বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা। পাখির গানে সৈকতের নির্জনতা ভাঙ্গে। গোপালপুর থেকে অটো বা গাড়িতে বেড়িয়ে নেওয়া যায়। পথে পড়বে গোল্ডেন বিচ, হিলটপ, রামমন্দির, ভৈরবী মন্দির প্রভৃতি। এখানে সাগরবেলার গায়েই অনেক হোটেল আছে।

লোকেশন      ভ্রমণ গাইড/কিভাব  যাবেন 
গোপালপুর থেকে ৮৮ কিমি দূরে ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশের সীমান্তে নির্জন সৈকত সোনাপুর।নিকটতম স্টেশন বেরহামপুর। হাওড়া চেন্নাই পথে এই স্টেশন। রেল স্টেশন থেকে বাসস্ট্যান্ড পৌঁছে বাস বা প্রাইভেট গাড়িতে ১৬ কিমি দূরে গোপালপুর সৈকতে পৌঁছানো সহজ।
দাড়িংবাড়ি
দাড়িংবাড়ি

৬.দাড়িংবাড়ী

দারিংবাড়ি উড়িষ্যা রাজ্যের কন্ধমাল জেলার একটি উল্লেখযোগ্য শৈলশহর, মনোরম আবহাওয়ার আকর্ষণীয় শৈলময় পরিবেশের জন্য একে “উড়িষ্যার কাশ্মীর”[১] নামে ডাকা হয়ে থাকে। উড়িষ্যার কন্ধমাল জেলায় এই পার্বত্যময় জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ৯১৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থান করছে। পূর্বঘাট পর্বতশ্রেণির বিভিন্ন শৃঙ্গগুলি উঁচুনিচু তরঙ্গায়িত ছন্দে শহরটিকে ঘিরে আছে।

অপূর্ব নৈসর্গিক পরিমণ্ডল স্থানটিকে স্বর্গীয় মাধুর্য দান করেছে। এর চতুর্দিকে কোথাও পাইন জঙ্গল, কোথাও নিবিড় শালবন, কফি বাগিচা বা সবুজ উপত্যকা যেন প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে । পাশাপাশি আছে ঘন রেন ফরেস্ট আর বন্য জীবজন্তুর আনাগোনা। 

শীতের দিনে এখানে যথেষ্ট ঠাণ্ডা পড়ে, এখনও পর্যন্ত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নথি অনুযায়ী বেশ অনেকটাই। শীতের দিনে কোনো কোনো সময় ঘাসের ডগায় বরফ জমে থাকতে দেখা যায়। দারিংবাড়িতে একটি ব্লক ও তহসিল হেডকোয়ার্টার আছে যেটার মোট আয়তন ৭৬৯.৬৮ বর্গ কিমি.। 

মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬৩ ভাগ কন্ধ উপজাতির মানুষ। স্থানীয় কুইভাষায় ‘দারিং’- শব্দের অর্থ উপত্যকা, আর ‘বাড়ি’- অর্থে ঘর, সেইদিক থেকে ‘দারিংবাড়ি’ – শব্দের অর্থ হলো- উপত্যকার বাড়ি। নিঃশব্দের একটা ভাষা আছে তা দারিংবাড়িতে না গেলে আপনারা সেটা বুঝতে পারবেন না।

ডোডোবাড়া লাভার্স পয়েন্ট, দারিংবাড়ি, উড়িষ্যা

ডোডোবাড়া বা লাভার্স পয়েন্ট– দারিংবাড়ি থেকে ১৯ কিমি. দূরে সদর মহকুমা শহর বালিগুডা যাওয়ার পথে কিরিকুটি নামক গ্রামের নিকট ঘন সবুজ অরণ্যের মাঝে এ স্থানটি অবস্থিত। অসাধারণ সৌন্দর্যে ভরা স্থানটিকে পাহাড়ী নদীর সশব্দ প্রবাহ আরও আকর্ষণীয় করেছে । স্থানটির কাছাকাছি বেশ কয়েকটি স্বাভাবিক গুহা বিদ্যমান। চাইলে উৎসাহী পর্যটকেরা এখানে পিকনিকের আয়োজন করে সারাটা দিন অনির্বচনীয় প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করতে পারেন।

কফি ও গোলমরিচ বাগিচা, দারিংবাড়ি, উড়িষ্যা

কফি বাগিচা– এখানে কফি ও গোলমরিচ বাগান পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। ৪৫ হেক্টর জমিতে বিস্তৃত এই বাগিচা উড়িষ্যা সরকারের ভূমিসংরক্ষণ ও বনদপ্তর বিভাগ তত্ত্বাবধান করে থাকে। অসংখ্য রূপালী রঙের ওক গাছে আবৃত বাগানটি আর গোলমরিচ লতাগুলি গাছগুলিকে আশ্রয় করে অদ্ভুত সৌন্দর্য সুষমা রচনা করেছে ।

মড়ুবান্দা জলপ্রপাত– দারিংবাড়ি থেকে ১৫ কিমি. দূরে বামুনিগাম যাওয়ার পথে ঘন অরণ্যময় পরিবেশে এই সুদৃশ্য জলপ্রপাতটি বর্তমান । স্থানীয় কুইভাষায় ‘মড়ু’ শব্দের অর্থ ময়ূর আর ‘বান্দা’ অর্থে পুকুরকে নির্দেশ করে।দারিংবাড়ী শৈল শহর,দারিংবাড়ি হতে ১৫ কি.মি. দূরে মড়ুবান্দা জলপ্রপাত, খুব বড় জলপ্রপাত নয় কিন্তু রূপ বৈচিত্র্যে ভরপুর। 

দারিংবাড়ি বেড়াতে এলে এই জলপ্রপাত দেখতে দর্শনার্থীদের ভুল হয় না। ছোট ছোট পাথরের উপর গড়িয়ে পড়া পানির জলধারা সমতলের দিকে প্রবাহিত এই যে কত অপরূপ দৃশ্য এখানে না এলে তা বোঝা দায়। দারিংবাড়ি ওড়িশা-এ জলপ্রপাত অবস্থিত দারিংবাড়ি উড়িষ্যায় যার অবস্থান।

দুলুরি নদী– অপরিমিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে পাহাড়ী দুলুরী সুন্দরী বয়ে চলেছে সঙ্গে আছে সুদৃশ্য জলপ্রপাত। পাইন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সশব্দে বয়ে যাওয়ার দুলুরির নৈসর্গিক দৃশ্যময়তা প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকের সৌন্দর্য পিয়াসী মনকে থমকে দিতে সক্ষম।

পুতুদি জলপ্রপাত– এটি উড়িষ্যার অন্যতম জলপ্রপাত, চারিদিক ঘন অরণ্যে আবৃত। দারিংবাড়ি থেকে ১২৫ কিমি.দূরে ফুলবনী ব্লকে এর অবস্থান।

বেলঘর অভয়ারণ্য– দারিংবাড়ি থেকে ৫০ কিমি. দূরে এই ক্রান্তীয় অরণ্যভুমি নিঃসন্দেহে এখানকার বড় আকর্ষণ। ১৬,১৭৪,৪৬ একর জুড়ে বিস্তৃত এই অরণ্যভূমি যার মধ্যে ৩৮৭৬.৪৪ একর ভূমি চাষযোগ্য আর বাকিটা সংরক্ষিত বনভূমি। গভীর এই অরণ্যে বড় বড় দাঁতাল হাতি সহ বিভিন্ন বন্য জীবজন্তুর বাস।

হিল ভিউ পার্ক, দারিংবাড়ি, কন্ধমাল জেলা, উড়িষ্যা

হিল ভিউ পার্ক– এই হিল ভিউ পার্কটি দারিংবাড়ি থেকে মাত্র এক কিমি.দূরে বালিগুডা যাওয়ার পথে অবস্থিত। পার্কের ওয়াচ টাওয়ার থেকে সমগ্র দারিংবাড়ি এবং তার পারিপার্শ্বিক অঞ্চল দৃশ্যমান।

উড়িষ্যাতে বেড়াতে এলে দারিংবাড়ি আসে না এমন দর্শনার্থী পাওয়াই যাবে না। অনেকগুলো দৃষ্টিনন্দন জলপ্রপাত, পাইন বন, সবুজ চাদরে মোড়া উঁচু-নিচু পাহাড়, দর্শনার্থীদের জন্য পিকনিক স্পট, শিল্পীদের চিত্রাংকনের জন্য দারিংবাড়ি একটি বহুল প্রত্যাশিত স্থানের নাম। তাই অবশ্যই দারিংবাড়িতে আসার আমন্ত্রণ রইল।

লোকেশন ভ্রমণ গাইড /কিভাবে যাবেন 
উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে দারিংবাড়ির দূরত্ব ২৫১ কিলোমিটার।দারিংবাড়ির নিকটতম রেলস্টেশন গঞ্জাম জেলার ব্রহ্মপুত্র ট্রেন যোগে অথবা বেহরামপুর সড়ক পথে ১২০ কিলোমিটার পথ বাসযোগে দারিংবাড়ি পৌঁছানো সম্ভব।

তবে দারিংবাড়িতে যাওয়ার জন্য ট্রেন স্টেশন থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে যাওয়ায় সবথেকে ভালো লোকাল ট্রাভেলে এসব গাড়ি না পাওয়াও যেতে পারে।

৭.উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি 

মানুষের তৈরি শিল্প শিল্পীর নিপুন প্রচেষ্টাকে সার্থক রূপ দেয়। মুহূর্তের মধ্যে মাথাটা ঘুরে যায় অনেক ভাবার পরও পাওয়া যায় না কোন ব্যাখ্যা। সেই শিল্প আগামী প্রজন্মের কাছে হয়ে দাঁড়ায় এক অভাবনীয় বিস্ময়। তেমনি বিস্ময়কর শিল্পের এক অসাধারণ শিল্প হল উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি। উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি মূলত দুইটি পাহাড়। এটি উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বরে অবস্থিত রাস্তার দুই প্রান্তে মুখোমুখী দাঁড়ানো দুইটি কিছুটা প্রাকৃতিক ভাবে আর কিছুটা কৃত্রিম ভাবে সৃষ্টি হয়েছে এই পাহাড়।

উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি একসময় একটাই পাহাড় ছিল। যখন এই দুই পাহাড় মিলিত ছিল তখন এর নাম শুধুমাত্র উদয়গিরি ছিল। উদয়গিরি নামকরণের পিছনেও রয়েছে একটি বিশেষ কারণ। উদয়গিরি শব্দের অর্থই হচ্ছে “উদিতমান সূর্য”। সূর্য যখন তার রশ্মি ছড়িয়ে উদিত হয় তখন প্রথমেই এসে পড়ে এই উদয়গিরির ওপর সেই থেকেই নাম হয় উদয়গিরি। উড়িষ্যা যেহেতু মন্দিরের রাজ্য তাই যখন উড়িষ্যার বিভিন্ন প্রান্তে যখন মন্দির নির্মাণ করা হতো তখন এই উদয়গিরির পাথর কেটে কেটে নিয়ে যেত। 

একসময় এই পাথর কাটতে কাটতে উদয়গিরি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, মাঝখান থেকে হয়ে যায় একটি রাস্তা। সেই থেকে উদয়গিরি দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং দুইটি আলাদা আলাদা নামকরণ করা হয়। এখন এক প্রান্তে উদয়গিরি ও অন্য প্রান্তে খণ্ডগিরি। কতগুলো গুহার সমন্বয়ে গঠিত যা প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দিক থেকে বিশেষভাবে গুরুত্ব রয়েছে। পাহাড় দুটিতে গুহা যথাক্রমে ১৮টি এবং ১৫ টি সর্বমোট ৩৩ টি সৃষ্ট আছে। 

এই গুহাগুলো সম্পর্কে ইতিহাসের পাতায় কিছু না লেখা থাকলেও বিশ্বাস করা হয় জৈন সন্ন্যাসীরা এই গুহাগুলো ব্যবহার করতেন। বিশ্বাস করা হয় সন্ন্যাসীরা এই গুহাগুলো সাধনা, ধর্মীয় আলোচনা ও তাদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই গুহা গুলি ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের মৌলিক সরঞ্জাম গুলো ব্যবহার করে সুন্দরভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রত্যেকটি গুহার সামনে তার পৌরাণিক অর্থ ও বর্ননা রয়েছে। এই বেলে পাথরের গুম্ফা দেখতে দূর দূরান্ত থেকে হাজারো দর্শনার্থীরা ছুটে আসে প্রতিনিয়ত। 

আপনি যদি পুরাণ গুহা দেখতে চান তাহলে উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বরের উদয়গিরি ও খণ্ডগিরিতে আসতে পারেন। 

লোকেশনভ্রমণ গাইড/ কিভাবে যাবেন 
উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর থেকে ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি। উড়িষ্যা থেকে প্রথমেই আপনাকে ভুবনেশ্বর আসতে হবে তারপর সেখান থেকে আপনি অটোতে করে খুব সহজেই উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি দর্শন করতে পারবেন। 

উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি দর্শন করতে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। 

৮.ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপ 

সবুজে ঘেরা বিস্তৃত একটি প্রান্তর তার মাঝেই রয়েছে একটি মাঝারি উচ্চতার পাহাড় যার নাম ধৌলি গিরি। আর এই পাহাড়ের ওপরেই নজর কাড়ে সুন্দর দৃষ্টিনন্দন ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপ। ধৌলি পাহাড়ের মাথার মুকুট হয়ে বসে আছে এই শান্তি স্তূপ। বর্তমানে উড়িষ্যার একটি দারুন পর্যটন স্পট এই ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপ। শুধু তাই নয়! এটি ভারতের ইতিহাসে এক অন্যতম ঘটনার সাক্ষী হিসেবে স্বগর্বে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পর থেকে ধৌলি গিরি সবার মাঝে অন্যরকম পরিচয়ে পরিচিত। 

সমতলভূমি, বনভূমি এবং দয়া নদী বেষ্টিত, পাহাড় গুলো শুধুমাত্র উড়িষ্যা নয় ভারতের ইতিহাসে উচ্চ মর্যাদা বহন করছে। এই ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপ সেই স্থান যেখানে মৌর্য রাজ্য ও কলিঙ্গ রাজ্যের ভেতর অনেক বড় যুদ্ধ হয়েছিল। যেই যুদ্ধের কথা আজও ভারতীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। যুদ্ধের পর এই পাহাড় গুলো স্মারক তৈরি করা হয়েছে যাকে ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপ নামে ভূষিত করেন। এই বুদ্ধের স্তূপে চারদিকে আছে চারটি ভিন্ন ভিন্ন বুদ্ধমূর্তির প্রতিমা। এছাড়া স্তুপের প্রত্যেকটি দেয়ালে বুদ্ধের জীবনী ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 

দেখেই বোঝা যায় নিখুঁত কারিগর দ্বারা এগুলো চিত্র আকৃতিতে সাজানো হয়েছে। শান্তি স্তূপের সামনেই রয়েছে দুইটি রাজ সিংহের ভাস্কর্য। সত্যি চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সাদা শান্তি স্তূপটি। স্তূপটির মাথায় আছে পাঁচটি ছাতা আছে। এই ছাতা গুলো হলো বৌদ্ধ ধর্মের পাঁচটা প্রধান দিককে স্মরণ করিয়ে দেয় ১. জ্ঞান ২. দয়া ৩. ধৈর্য ৪. উদারতা ও ৫. ক্ষমার প্রতিক। এই প্যাগোডা দর্শন করতে দূর থেকে বৌদ্ধরা ছুটে আসে। বৌদ্ধমূর্তি দেখতে আসে ভিন দেশের মানুষেরাও।

এখানে সোমবার বাদে প্রতি দিন লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো এর আয়োজন করা হয়। এই শো এর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক জিনিস হল লেজার লাইট শো। আশ্চর্যজনক কেনো বললাম? আশ্চর্যজনক বলেছি কারন এই শো এ রাজা অশোকের জীবনী চিত্রিত করে এবং কালিঙ্গ যুদ্ধের বর্ননা চিত্রিত করে দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করে। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো এর জন্য জনপ্রতি ২৫ রুপি ও ছাত্রদের জন্য জনপ্রতি ১০ রুপি করে দিয়ে উপভোগ করতে পারবেন। 

ধৌলি গিরি পাহাড়ে কালিঙ্গ ধৌলি মহা উৎসব পালিত হয়। এটি এই পাহাড়ের প্রধান উৎসব। তিনদিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানের শামিল হয় উড়িষ্যার সকল পর্যটকরা। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই অনুষ্ঠান খুবই ধুমধাম করে আয়োজিত হয়। প্রতিবছর অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক নৃত্য, সাংস্কৃতিক সংগীত ও মার্শাল আর্ট নিত্য পরিবেশন এর জন্য বিখ্যাত। সারাদেশের বিখ্যাত সব নিত্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী ও ৫০০ টা বেশি পারফরম্যান্স করতে শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানের যোগদান করেন।

ধৌলি গিরি ভুবনেশ্বর শহরের সৌন্দর্য ও দয়া নদীর অপরূপ সৌন্দর্যের মাধুর্যতা উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। ধৌলি গিরি পাহাড়ের উপর থেকে পরিবেশটা এক কথায় শ্বাসরুদ্ধকর। সেখানের পরিবেশ এতটাই শান্ত যে নিবিশের মধ্যে আপনার মন শান্তিময় হয়ে উঠবে। নদীর ঠান্ডা হাওয়া অবিরাম বয়ে চলে সেখানে। এই ঠান্ডা হাওয়া আপনার মনকে শীতল করে দেবে। এই পাহাড়ের সবচেয়ে বেশি আকর্ষন হলো শান্তি স্তূপ ও অশোক শিলা লিপি। 

আপনি যদি ভারতের এই ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপ দর্শন করতে আসেন আপনার মন ও ঠান্ডা হয়ে যাবে। ধুয়ে যাবে সব অহংকার। মুহুর্তেই প্রেমে যাবেন ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপের সাথে আপনার দেখা সবচেয়ে সুন্দর প্যাগোডার মধ্যে এই শান্তি স্তূপ ও অন্যতম হয়ে উঠবে বলে মনে করা যায়। 

লোকেশনভ্রমণ গাইড/ কিভাবে যাবেন 
উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে দয়া নদীর পাড়ে অবস্থিত ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপ। আপনি ভারতের যেকোনো স্থান থেকে খুব সহজেই ধৌলি গিরি শান্তি স্তূপে বাস, ট্যাক্সি, ক্যাব ভাড়া করে যেতে পারবেন। 

আপনি যদি ট্রেন যোগে শান্তি স্তূপে আসতে চান তাহলে ভুবনেশ্বর ট্রেন স্টেশনে নেমে লোকাল গাড়ি ভাড়া করে কিংবা নিজস্ব ক্যাপ ভাড়া করে যেতে পারবেন অল্প সময়েই। 

সকাল ৬ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য একটি উন্মুক্ত থাকে তবে দুইটি নাইট শো এর জন্য ৬:৩০ টা থেকে ৭:৩০ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। 

সপ্তাহের সাত দিন খোলা থাকে ধৌলি প্যাগোডা। 

পরিশেষে 

অবসর সময়টাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেলে কার না যেতে মন চায় অজানা কোন দেশে যেখানে গেলে মন চাইবে আরো আরেকবার আসি ? ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর এতটাই সুন্দর মনমুগ্ধকর উনি সেখানে গেলে বারবার যেতে মন চাইবে। ভ্রমণ পিপাসু বাঙালির ব্যস্ততার কারণে, মনের সুপ্ত ইচ্ছা জাগে হারিয়ে যেতে কোনো অজানার সন্ধানে।

রূপ বৈচিত্রে ভরপুর নানান শিল্প শৈলী, আধুনিকতার ছোঁয়া, পুরানো ইতিহাসের গল্পকথা আর ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সমন্বয়ে ওড়িশা নগরী বহুল পরিচিত একটি রাজ্যের নাম। প্রিয়জন কিংবা বন্ধুবান্ধব অথবা নিজেকে একটু কাজের ব্যস্ততা থেকে ছুটি দিতে অনেক দর্শনার্থী ছুটে আসেন পূর্ব ভারতের ওড়িশা রাজ্যে।

আপনার পরের গন্তব্যটা যদি উড়িষ্যা রাজ্য হয়ে থাকে হলফ করে বলতে পারি আপনি একটুও ঠকবেন না । এখানে সবকিছু উপভোগ করে বুঝতে পারবেন আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলো এর সৌন্দর্যতা। আসুন দেখুন উপভোগ করুন আর সঙ্গে করে নিয়ে যান মধুর স্মৃতি।ধন্যবাদ।

আরো পড়ুন –

Related Post

খুশির স্ট্যাটাস

200+ স্টাইলিশ খুশির স্ট্যাটাস | হাসি নিয়ে ক্যাপশন

খুশির স্ট্যাটাস | হাসি নিয়ে ক্যাপশন জীবনের সুন্দর খুশির মুহূর্ত আমরা সবাই বাঁধাই করে রাখতে চাই। আর এই খুশির মুহূর্তকে ধরে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায়

Read More »
❤love status bangla | ভালোবাসার ছন্দ | রোমান্টিক ছন্দ | প্রেম ছন্দ স্ট্যাটাস❤

স্টাইলিশ ভালোবাসার ছন্দ | রোমান্টিক ছন্দ | Love Status Bangla

❤❤ভালোবাসার ছন্দ | ভালোবাসার ছন্দ রোমান্টিক | ভালোবাসার ছন্দ স্ট্যাটাস❤❤ ভালোবাসা হলো এক অন্যরকম অনুভূতির নাম, যা শুধুমাত্র কাউকে ভালবাসলেই অনুভব করা যায়। আমরা বিভিন্নভাবে

Read More »
মন খারাপের স্ট্যাটাস

মন খারাপের স্ট্যাটাস, উক্তি, ছন্দ, ক্যাপশন, কিছু কথা ও লেখা

মন খারাপের স্ট্যাটাস মন খারাপ – এই কষ্টের অনুভূতি কার না হয়? সবারই কখনো না কখনো সবারই মন খারাপ হয়। জীবনের ছোটোখাটো অঘটন থেকে শুরু

Read More »
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের উক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলা হয় বিশ্বকবি। তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও গুনী লেখক। প্রেম চিরন্তন এবং সত্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালীর মনে প্রেমের

Read More »
ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা

ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা | Breakup Status Bangla

ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা আপনি কি আপনার প্রিয়জনের সাথে সম্পর্ক থেকে বের হয়ে এসেছেন? আর সেটা আপনি কোন ব্রেকআপ স্ট্যাটাস বাংলা মাধ্যমে বোঝাতে চাচ্ছেন। তাহলে আপনি

Read More »

Leave a Comment

Table of Contents